বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বন্যপশু শিকার বা পাহাড়ি কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়ে আবারও রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি ঘটেছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পুঁতে রাখা নিষিদ্ধ স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিন পাহাড়ি বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আজ রোববার (২৪ মে) দুপুরে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ৪১ ও ৪২ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী আন্তর্জাতিক শূন্য রেখায় (জিরো লাইন) এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, জীবিকার তাগিদে জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করতেই তারা এই মরণঘাতী মাইনের কবলে পড়েন।
নিহতরা হলেন, ঘুমধুম ইউনিয়নের বাসিন্দা সুনইয়ং চাকমার ছেলে লেঠাইয়া চাকমা (৪১), নিওমং চাকমার ছেলে অংক্যামং চাকমা (৫০) এবং অইমং চাকমার ছেলে চিংক্যা অং চাকমা (৪০)। তারা সবাই স্থানীয় নৃগোষ্ঠীর বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্র ও বিজিবি জানায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অঞ্চলের পাহাড়, ঘন ঝোপজঙ্গল আর দুর্গম পথকে ঘিরেই স্থানীয় পাহাড়ি মানুষের জীবন-জীবিকা। আজ দুপুরে কাঠ সংগ্রহের জন্য ওই তিন পাহাড়ি নাগরিক অজান্তেই সীমান্তের শূন্য রেখা (জিরো লাইন) অতিক্রম করে মিয়ানমার অংশে প্রবেশ করেন। সেখানে আগে থেকেই পুঁতে রাখা শক্তিশালী স্থলমাইন তাদের পায়ের স্পর্শে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়।
বিস্ফোরণে তিনজনেরই হাত-পা উড়ে যায় এবং তারা রক্তাক্ত অবস্থায় পাহাড়ে ছিটকে পড়েন। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা ও স্বজনেরা দ্রুত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তাদের গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে কুতুপালংয়ের ‘এমএসএফ’ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিনজনকে-ই মৃত ঘোষণা করেন।
বিজিবির রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “নিহত তিন বাংলাদেশির মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে এবং কার প্ররোচনায় তারা এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত রেখায় গিয়েছিলেন, তা গভীরভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। এই ঘটনার পর সীমান্তে বিজিবির টহল আরও জোরদার করা হয়েছে এবং জওয়ানরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
এদিকে বিজিবির আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, “বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে এবং স্বাভাবিক রয়েছে। তবে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সাধারণ পাহাড়ি ও স্থানীয় মানুষকে কোনো অবস্থাতেই শূন্য লাইন, কাঁটাতারের বেড়া এবং সীমান্তসংলগ্ন গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ে যাতায়াত না করার জন্য বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার কঠোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও সীমান্ত সচেতন মহলের মতে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিপি) এবং জান্তা সেনারা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহীদের দমনে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জিরো লাইনে বিপুল পরিমাণ অ্যান্টি-পারসোনেল স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাত্র দেড় বছরে নাইক্ষ্যংছড়ি ও উখিয়া সীমান্তে এই মরণফাঁদ স্থলমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ২০ জন সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিক নিজেদের পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং আজকের ঘটনাসহ প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬ জন। বারবার সীমান্ত উত্তেজনার মাঝে এই ধরনের প্রাণহানি স্থানীয় সীমান্তবাসীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।


আপনার মতামত লিখুন :