বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে দেশের শ্রমবাজার দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা এবং ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে।
আজ সোমবার (১৮ মে) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক সেমিনারে এই তথ্য জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংকিং সম্পদ এখন মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিগত ২০২৫ সালে দেশে নতুন করে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২২ সালের পর থেকে দেশের মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে যা আর নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
সংস্থাটি বলছে, পণ্য পরিবহনে উচ্চ ব্যয়, আমদানি ও বাজারজাতকরণ খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মূলত মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর, যার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশচুম্বী হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে মাত্র ৩ দশমিক ৯ শতাংশে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, গত ৩৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমে গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাত পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছে না। তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে কমে মাত্র ৬ শতাংশে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের জানুয়ারিতে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্তগুলোও চাপের মুখে পড়ছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক চিত্র তুলে ধরে বিশ্বব্যাংক জানায়, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের ২২টি ব্যাংক ভয়াবহ মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২২টি ব্যাংকের হাতেই রয়েছে পুরো ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংকিং সম্পদই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, যা সামগ্রিক আর্থিক খাতের জন্য বড় বিপদের সংকেত।
আর্থিক খাতের দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বড় ধস নেমেছে। ২০২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এর ফলে কর-জিডিপি অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশে। যদিও আগামী ২০২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বাড়তে পারে বলে আশা করছে বিশ্বব্যাংক।
রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও, তা বর্তমান অর্থবছরে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
সেমিনারে উপস্থিত অর্থনীতিবিদরা বলেন, কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ‘টাইম বোম্ব’। যুবসমাজকে যদি দ্রুত কর্মসংস্থানের আওতায় আনা না যায় এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা না হয়, তবে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও ধরে রাখা কঠিন হবে। সংকট উত্তরণে কর কাঠামোর সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের তাগিদ দিয়েছেন তারা।


আপনার মতামত লিখুন :