ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

পশু ছাড়াই আরও একটি কোরবানি ঈদ, হজে বাধা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম

পশু ছাড়াই আরও একটি কোরবানি ঈদ, হজে বাধা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার বাসিন্দা নাজিয়া আবু লেহিয়ার তীব্র ইচ্ছে ছিল স্বামীর হাত ধরে পবিত্র মক্কায় গিয়ে হজ পালন করবেন। ২০২৪ সালে সেই সুযোগ এসেছিল, হজের জন্য নির্বাচিতও হয়েছিলেন এই দম্পতি। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ থাকায় সেবার আর মক্কায় যাওয়া হয়নি। চলতি বছরও হজ পালন করা হচ্ছে না নাজিয়ার। তবে এবার শুধু সীমান্ত বন্ধ হওয়াই কারণ নয়; গত বছর ইসরায়েলি বিমান হামলায় নাজিয়ার স্বামী চিরতরে হারিয়ে গেছেন। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ৬৪ বছর বয়সী নাজিয়া এখন দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি শরণার্থী তাঁবুতে একা বাস করছেন।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নাজিয়া আবু লেহিয়া তার এই অপূর্ণ স্বপ্ন ও যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন।

তাঁবুতে বসে অশ্রুসজল চোখে নাজিয়া এএফপি-কে বলেন, “আমি এবং আমার স্বামী ২০২৪ সালের হজের জন্য নাম নিবন্ধন করেছিলাম, আমরা নির্বাচিতও হয়েছিলাম। কিন্তু এর মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল, রাফা সীমান্ত বন্ধ হয়ে গেল... আমাদের আর হজে যাওয়া হলো না। ভেবেছিলাম যুদ্ধ শেষ হলে সীমান্ত খুলে দেওয়া হবে। কিন্তু গত বছর এক আকস্মিক বোমা হামলায় আমার স্বামী নিহত হলেন।”

কয়েক বছর আগে থেকেই হজের নিয়ত করে টাকা জমাচ্ছিলেন নাজিয়া। বর্তমানের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমার মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হয় যে আমিও হয়তো আমার স্বামীর মতো কোনো একদিন বোমার আঘাতে মারা যাব। কিন্তু তারপরও আমি আল্লাহর ওপর আশা ছাড়িনি। যদি আল্লাহর ইচ্ছে হয় অবশ্যই আমি একদিন মক্কায় গিয়ে হজ করতে পারব।”

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে গাজার হজযাত্রীরা রাফা ক্রসিং পেরিয়ে মিসর হয়ে সৌদি আরবে হজ করতে যেতেন। কিন্তু গাজাবাসীদের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত এই ক্রসিংটি যুদ্ধের শুরুতেই বন্ধ করে দেয় ইসরায়েল।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় যে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে, তার আওতায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে রাফা ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সপ্তাহে মাত্র কয়েক শ গাজাবাসীকে এই সীমান্তপথ পেরোনোর অনুমতি দিচ্ছে ইসরায়েল, যেখানে মূলত গুরুতর অসুস্থ বা আহতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নিজের মোবাইল ফোনে হজের ভিডিও ফুটেজ দেখতে দেখতে নাজিয়া প্রশ্ন করেন, “হজযাত্রীদের জন্য সীমান্ত বন্ধ রাখা হয়েছে কেন? তারা তো কোনো যুদ্ধ করতে যাচ্ছে না, শুধু তাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পালন করতে চায়। আজ এই দিনে আমাদের মক্কার পবিত্র ভূমিতে থাকার কথা ছিল।”

গাজার সীমান্ত ক্রসিং ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা ‘কোগাট’ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে কেবলমাত্র জরুরি মানবিক কারণে রাফা ক্রসিং উন্মুক্ত করার বিষয়টি উল্লেখ আছে। হজযাত্রা এই মানবিক ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে না, তাই গাজার মুসলমানদের জন্য হজের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের আগে গাজার মুসলিমরা ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার গরু-উট এবং ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার ভেড়া-দুম্বা আমদানি করত। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় জীবন্ত পশু আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে গত ২০২৪ সালের মতো এবারও পশু কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ঈদুল আজহা উদযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে গাজার ফিলিস্তিনিরা।

আগামী ২৭ মে গাজায় ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। ইসরায়েলি সংস্থা কোগাট সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে তারা প্রায় ৮ হাজার টন হিমায়িত মাংস, মুরগি, ডিম ও দুধ গাজায় প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, যা বাসিন্দাদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। তবে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী জীবন্ত পশু এনে কোরবানি করার কোনো অনুমতি এখনও দেয়নি ইসরায়েলি প্রশাসন।

স্বজন হারানোর বেদনা, ধ্বংসস্তূপের জীবন আর ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণের এই ত্রিমুখী সংকটে গাজার লাখো মুসলিমের ঘরে এবারও কোরবানির ঈদ আসছে কেবলই এক নিরানন্দ রুটিন হয়ে।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!