ইরান যুদ্ধ নিয়ে কীভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার, সে বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে ট্রাম্পকে আপাতত সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে এসে কূটনৈতিক আলোচনাকে সুযোগ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা গেছে, অন্যদিকে নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনকে এখনই ইরানে হামলার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং ইসরায়েলি সূত্রগুলো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে। দুই নেতার এই ফোনালাপের খবরটি প্রথম প্রকাশ করে মার্কিন গণমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’।
সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে দুই নেতার মধ্যে এটাই প্রথম কথোপকথন নয়। এর আগে গত রোববারও (১৭ মে) তারা ফোনে কথা বলেছিলেন। সে সময় ট্রাম্প দিনকয়েকের মধ্যেই ইরানে একটি নতুন সামরিক অভিযানের দিকে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রসর হচ্ছে বলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সিএনএন-এর তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এবার ইরানে কোনো অভিযানে গেলে তার কোড নেম হতে পারে ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’।
কিন্তু রোববারের ওই ফোনালাপের মাত্র ২৪ ঘণ্টা পরই নাটকীয়ভাবে ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোর বিশেষ অনুরোধে তিনি মঙ্গলবারের পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেছেন। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উপসাগরীয় দেশগুলো হোয়াইট হাউসের সঙ্গে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
ওয়াশিংটন-তেহরানের এই চলমান আলোচনা ও যুদ্ধ স্থগিতের সিদ্ধান্তে চরম ‘হতাশ’ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি চান ইরানের বিরুদ্ধে আরও ‘আগ্রাসী’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এখনই হামলা চালানো হোক। নেতানিয়াহুর যুক্তি—এক্ষেত্রে যত দেরি করা হবে, পরমাণু কর্মসূচি ও রণকৌশল গোছাতে ততই ইরানের লাভ হবে।
মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ঘণ্টাব্যাপী চলা মঙ্গলবারের ফোনালাপে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেন, হামলা পিছিয়ে দেওয়া একটি ‘বড় ভুল’ হবে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের উচিত পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া।
তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এই চাপ বা হতাশা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান বেশ শক্ত। বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প স্পষ্ট ইঙ্গিত দেন যে, এই যুদ্ধের চালকের আসনে মূলত তিনিই আছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ট্রাম্প কী বলেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি বলেন: “তিনি (নেতানিয়াহু) তা-ই করবেন, যা আমি চাইবো।”
বুধবার সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প ইরান পরিস্থিতি নিয়ে তার চিরচেনা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও হুমকির নীতি বজায় রেখে বলেন, “ইরানে আমরা চূড়ান্ত পর্বে রয়েছি। দেখা যাক কী ঘটে। হয় আমরা একটি চুক্তি পাবো, নয়তো আমরা এমন কিছু করবো যা খানিকটা নোংরা ধরনের (আগ্রাসী সামরিক হামলা)। আশা করছি তেমন কিছু করতে হবে না।”
ট্রাম্প আরও সতর্ক করে বলেন, “যদি আমরা সঠিক উত্তর না পাই, খুব দ্রুতই (যুদ্ধ) শুরু হয়ে যাবে। আমরা শুরু করার জন্য প্রস্তুত।”
এদিকে মার্কিন প্রশাসন যখন যুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে, তখন পর্দার আড়ালে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চিঠি চালাচালি অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেয়ি তাদের রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম ‘নুর নিউজ’-কে জানান, “ইরানের দেওয়া প্রাথমিক ১৪ দফার ভিত্তিতে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার বার্তা বিনিময় হয়েছে। আমরা মার্কিনিদের মতামত পেয়েছি এবং এখন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
মূলত হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত নৌচলাচল, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত ইরানি সম্পদ ফেরত এবং চলমান যুদ্ধের ক্ষতিপূরণসহ নানা জটিল ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বড় ধরনের ভিন্নতা রয়েছে, যা আগামী দিনগুলোতে এই দুই মিত্রের সম্পর্কে নতুন ফাটল তৈরি করতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :