মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে তেহরানে কাতার ও পাকিস্তানের নজিরবিহীন যৌথ কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার পরোক্ষ আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করে জরুরি ভিত্তিতে হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন।
বিবিসির নিউজ পার্টনার ‘সিবিএস নিউজ’ পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবার থেকেই এই নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যদিও শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সবুজ সংকেত বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ইরান সংকটের তীব্রতা যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায়। ট্রাম্প জানিয়েছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব’ পালনের কারণে তিনি শনিবার তার নিজের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র-এর বিয়েতেও উপস্থিত থাকতে পারছেন না। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো নিউ জার্সির গলফ রিসোর্টে কাটানোর কথা থাকলেও ট্রাম্প তা বাতিল করে জরুরি যুদ্ধকালীন বৈঠকের জন্য হোয়াইট হাউসে অবস্থান করছেন।
একই সঙ্গে পেন্টাগন ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যপ্রাচ্য ডেস্কের কর্মকর্তাদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের ঘাঁটিতে প্রস্তুত থাকা সেনাদের তালিকা হালনাগাদ করার কাজ শুরু করেছেন। তবে একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত কিছু মার্কিন সেনাকে কৌশলগতভাবে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে যুদ্ধ শুরু হলে তারা ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হয়।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সীমারেখা খুব স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন: ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং তারা কোনো অবস্থাতেই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত রাখতে পারবে না।”
এদিকে যুদ্ধ এড়াতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখতে তেহরানে এক ঐতিহাসিক মধ্যস্থতা মিশন শুরু করেছে কাতার ও পাকিস্তান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বার্তা নিয়ে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল শুক্রবার তেহরানে পৌঁছেছেন এবং তারা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন।
কাতারের পাশাপাশি এই মিশনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আসিম মুনির শুক্রবার সন্ধ্যায় আকস্মিকভাবে একটি সামরিক প্রতিনিধি দল নিয়ে তেহরানে অবতরণ করেছেন। সেখানে তাকে স্বাগত জানান ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দর মোমেনি এবং বুধবার থেকে তেহরানে অবস্থানরত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে সরাসরি স্বীকার করা হয়েছে যে, সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের এই সফরের মূল এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে’ আলোচনা টিকিয়ে রাখা।
ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার মাঝে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হয়েছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের একক সার্বভৌমত্ব ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করে ইরান একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করার পর সেখানে আন্তর্জাতিক জলসীমায় আটকা পড়েছেন প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি বিদেশি নাবিক।
গত তিন মাস ধরে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ অবস্থায় এসব নাবিক চরম খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে ভুগছেন। যেকোনো মুহূর্তে মার্কিন বা ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরু হলে তাদের জাহাজগুলো ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এমন মরণাতঙ্কে দিন কাটছে তাদের।
আটকে থাকা একটি তেলবাহী জাহাজ থেকে ভারতীয় নাবিক সালমান সিদ্দিক ফোনে রয়টার্সকে বলেন, “এখানে আমরা প্রতিটা মুহূর্ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। আমরা শুধু কোনোমতে রাত পার করার পরিকল্পনা করি আর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন আমাদের জাহাজ কোনো মিসাইল হামলার লক্ষ্যবস্তু না হয়।” সৌদি উপকূলের কাছে নোঙর করা এসব জাহাজের ডেক থেকে নাবিকদের ত্রাণের আশায় দিনভর হাত নাড়তে দেখা গেছে।
গত এপ্রিলের শুরুতে একটি সাময়িক ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে দুই দেশ সরাসরি হামলা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির মালিকানা নিয়ে তেহরান নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় ট্রাম্পের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, কাতার ও পাকিস্তানের এই শেষ মুহূর্তের মধ্যস্থতা যদি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের কাছ থেকে কোনো বড় ধরনের ছাড় বা ‘১৪ দফা’র রফাদফা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ট্রাম্পের স্থগিত করা সেই ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’ যেকোনো মুহূর্তে পারস্য উপসাগরে আছড়ে পড়তে পারে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :