মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ও নাটকীয় মোড় দেখা দিয়েছে। টানা তিন মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি চূড়ান্ত চুক্তির একেবারে কাছাকাছি চলে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, দুই দেশের আলোচকেরা সমঝোতার দ্বারপ্রান্তে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ঐতিহাসিক চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে। ইরানি কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
শনিবার (২৩ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ ও অ্যাক্সিওস-কে দেওয়া পৃথক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেন। একই দিন দুই পক্ষের প্রধান মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানও আলোচনায় ব্যাপক অগ্রগতির কথা জানিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের তিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য এই চুক্তির আওতায় সব ফ্রন্টে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে, যার মধ্যে লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করে দেবে। কোনো ধরনের টোল বা ফি ছাড়াই আন্তর্জাতিক জাহাজ সেখানে চলাচল করতে পারবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
চুক্তির অন্যতম বড় অংশ হিসেবে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের জব্দকৃত বিপুল অর্থের মধ্য থেকে প্রাথমিক কিস্তিতে ২৫ বিলিয়ন ডলার (২৫০০ কোটি ডলার) তহবিল তাৎক্ষণিকভাবে ছেড়ে দেবে ওয়াশিংটন।
সিবিএস নিউজকে ট্রাম্প বলেন, “আমরা একটি চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র লাভ করা থেকে বিরত রাখব এবং তাদের মজুতকৃত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যাতে সন্তোষজনক উপায়ে সামাল দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা হবে। আমি কেবল এমন একটি চুক্তিতেই স্বাক্ষর করব, যেখানে আমরা যা যা চাই তার সবকিছুই পাব।”
কূটনীতি ও সামরিক আগ্রাসনের দুই বিপরীতমুখী অবস্থানে দোদুল্যমান ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে জানান, শনিবার রাতেই তিনি তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে ইরানের প্রস্তাবিত খসড়া চুক্তিটি নিয়ে বসবেন এবং রোববারের (২৪ মে) মধ্যে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
তেহরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ট্রাম্প বলেন: “আমরা হয় একটি অত্যন্ত ভালো চুক্তিতে পৌঁছাব, নতুবা নরকের আগুনে আমি তাদের উড়িয়ে দেব।”
এদিকে ট্রাম্পের ইউরেনিয়াম সংক্রান্ত বক্তব্যকে কিছুটা নাকচ করেছে তেহরান। তারা জানিয়েছে, বর্তমান খসড়া আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। এমনকি ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের (আই আর জি সি) একটি সূত্র ফার্স নিউজকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বরাবরের মতোই ইরানের সামরিক ব্যবস্থাপনায় থাকবে এবং এই নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ‘অপূর্ণাঙ্গ ও অবাস্তব’।
এই সম্ভাব্য চুক্তির সবচেয়ে চমকপ্রদ ও বৈপ্লবিক দিক হলো- মার্কিন প্রশাসন তাদের দীর্ঘদিনের পরম মিত্র ইসরায়েলকে এই পুরো আলোচনা প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ দূরে রেখেছে। সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই ‘বাইপাস’ নীতিতে তেল আবিবে চরম অস্বস্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চুক্তির খসড়াতে আসলে কী কী শর্ত রয়েছে, তা জানতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন ওয়াশিংটনের বদলে নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ-এর তথ্যের ওপর নির্ভর করছেন। এই গোপন চুক্তির খবর আসার পর নেতানিয়াহু তার শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন। আজ রোববারেও ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর একটি উত্তপ্ত ফোনালাপ হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালালে তিন পক্ষের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়, যা টানা ৪০ দিন ধরে চলে। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যেখান দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ হয়। ফলস্বরূপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে জ্বালানি পথ সচল করতে ছয় সপ্তাহ আগে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়।
মার্কিন প্রশাসন এই চুক্তির রূপরেখা নিয়ে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মিসর এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব মুসলিম দেশই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে ট্রাম্পকে এই চুক্তিটি গ্রহণ করার এবং ইসরায়েলের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকে উপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, রোববারের হোয়াইট হাউসের বৈঠক থেকে বিশ্ব এক ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি পায়, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আবার ‘নরকের আগুনে’ দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :