মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে খোদ প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ‘হোয়াইট হাউস’-এর ঠিক বাইরে এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা প্রাচীরের কাছে এক সশস্ত্র তরুণ অতর্কিত গুলিবর্ষণ শুরু করলে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস পুলিশও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে। এতে সিক্রেট সার্ভিসের গুলিতে একুশ বছর বয়সী ওই সন্দেহভাজন তরুণ নিহত হয়েছেন।
ঘটনার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন। তবে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে, ‘নিরাপত্তার আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি (প্রেসিডেন্ট) কিংবা হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এ ঘটনায় বিন্দুমাত্র প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি’।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৩ মে) সন্ধ্যা ৬টার কিছুক্ষণ পর হোয়াইট হাউসের ঠিক বাইরের ১৭তম স্ট্রিট ও পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ এলাকায় এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে।
সিক্রেট সার্ভিসের দেওয়া আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ এক তরুণ তার ব্যাগ থেকে একটি ভারী আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আচমকা গুলি চালানো শুরু করে। মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, হামলাকারী অন্তত ১৫ থেকে ৩০ রাউন্ড গুলি ছুড়েছিল।
গুলির শব্দ শোনার সাথে সাথেই হোয়াইট হাউসের লনে উপস্থিত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এবিসি নিউজের লাইভ ভিডিও ধারণ করার সময় প্রতিবেদক সেলিনা ওয়াং গুলির শব্দ শুনে ক্যামেরার সামনেই দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য দৌড়াতে শুরু করেন। তাৎক্ষণিকভাবে সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা সাংবাদিকদের দ্রুত ভবনের ভেতরে ‘প্রেস ব্রিফিং রুমে’ নিয়ে যান এবং পুরো হোয়াইট হাউস সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা ‘লকডাউন’ করে ফেলা হয়।
হামলাকারী সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টদের দিকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে এজেন্টরা কালবিলম্ব না করে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এতে বুক ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ওই বন্দুকধারী। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ক্রসফায়ারের মাঝে পড়ে দুর্ভাগ্যবশত একজন সাধারণ পথচারীও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে কোনো সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তা আহত হননি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, নিহত ওই সন্দেহভাজন হামলাকারীর পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। ২১ বছর বয়সী এই তরুণের নাম ‘নাসেয়ার বেস্ট’।
তদন্তে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। নাসেয়ার বেস্ট এর আগেও গত ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জোরপূর্বক হোয়াইট হাউসে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। সে সময় মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। ওই ঘটনার পর তার তীব্র মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা বা সাইকোসিস ধরা পড়ায় মার্কিন আদালতের নির্দেশে তাকে একটি মনোরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে বা পালিয়ে সে আবারও এই আত্মঘাতী হামলা চালাল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কাকতালীয়ভাবে, মাত্র এক মাস আগেই ‘হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস ডিনার’ (সাংবাদিকদের নৈশভোজ) চলাকালেও এক বন্দুকধারী একইভাবে গুলি চালিয়েছিল, যেখানে ট্রাম্পকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এক মাসের মাথায় আবারও একই ধরনের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
গুলির ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর রাত ৭টার দিকে হোয়াইট হাউসের লকডাউন তুলে নেওয়া হলেও চারপাশের সড়কগুলোতে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিবিসির ওয়াশিংটন সংবাদদাতা টম বেনেট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের দিকে যাওয়ার সমস্ত রাস্তা বড় ধরনের নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তদন্তকারীরা ব্যালেস্টিক ও ফরেনসিক আলামত সংগ্রহের জন্য পুরো রাতজুড়ে রাস্তাগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গুলি চলার সময় ট্রাম্প ভবনের ভেতরে থাকলেও এখনো পর্যন্ত এই হামলার বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত কোনো প্রতিক্রিয়া বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :