দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া হামের প্রাদুর্ভাভে পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। হামে প্রাণ হারানো শিশুদের প্রত্যেক পরিবারকে কেন পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং এই সংকটের পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে কেন ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশে হাম ও জলাতঙ্ক (র্যাবিস) রোগের টিকার বর্তমান প্রাপ্যতা, পর্যাপ্ততা এবং সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামা আকারে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজিএইচএস) নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল এবং বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’-এর পক্ষে গত ১০ মে এই জনস্বার্থে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির পল্লব। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে দেশে ভয়াবহ আকারে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছে। সঠিক সময়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় ইতিমধ্যে ৫০০-র বেশি শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
আদালতে শুনানির সময় রিটকারী আইনজীবী অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি বিশ্বস্ত উপায়ে টিকা সংগ্রহের দীর্ঘদিনের সফল ব্যবস্থা বাদ দিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ ‘উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি’ চালু করে। এর ফলেই মূলত দেশে জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই সিদ্ধান্তের ভয়াবহতা ও সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হলেও তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়।
রিটে আরও বলা হয়, শুধু টিকার অভাবই নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং শিশুদের জন্য বিশেষায়িত পিআইসিইউ-এর চরম সংকটের কারণে শত শত শিশু সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
এদিকে হাইকোর্টের এই আদেশের দিনই দেশের হাম পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার অধিদপ্তরের নিয়মিত স্বাস্থ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় (সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা) দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩৩৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে (প্রতিটিতে ৩ জন করে)।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ৫৮৬ জনে। এর মধ্যে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিতভাবে হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৭ হাজার ৯২৯ জন। সরকারি হিসাবেই গত দুই মাসে সন্দেহজনক হামে ৩৯৮ জন এবং নিশ্চিত হামে ৭৭ জনসহ মোট ৪৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বেসরকারি ও মাঠপর্যায়ের হিসাবে এই সংখ্যা পাঁচ শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদালতের এই নির্দেশনার পর আশা করা যাচ্ছে টিকার আমদানিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দ্রুত কাটবে। তবে মাঠপর্যায়ে জরুরি ভিত্তিতে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম বা বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করা না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :