বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে একের পর এক গুলিবর্ষণ, বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা এবং জোরপূর্বক পুশইনের (অনুপ্রবেশ করা)। চেষ্টার ঘটনায় দুই দেশের সীমান্তজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার (১৮ মে) সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে আকস্মিক পাল্টাপাল্টি গোলাগুলির ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং টহল টিমের সংখ্যা বাড়িয়েছে। তবে ঘন ঘন গুলির ঘটনায় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রামগুলোর বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কী ঘটেছিল সিলেট সীমান্তে?
সিলেটের ৪৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফট্যানেন্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক জানান, গত সোমবার বিকেলে ভারত সীমান্ত থেকে আকস্মিকভাবেই বিএসএফ গুলি ছুড়তে শুরু করে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তাৎক্ষণিকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পাল্টা গুলিবর্ষণ করে।
বিজিবির দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেও স্থানীয় চাষী ও বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। সোনারহাট সীমান্তের বাসিন্দা হেলাল উদ্দীন বলেন, “আমরা এখনো ভয়ে ভয়ে আছি। সীমান্ত এলাকায় থমথমে ভাব। বিজিবি আপাতত সীমানার কাছে যেতে নিষেধ করায় কেউ জানের ভয়ে ক্ষেত-খামারেও যাচ্ছে না।”
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, সীমান্তবাসীর ভয় ও উদ্বেগ দূর করে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে।
দেড় সপ্তাহে ৩ খুন, থামছে না সীমান্ত হত্যা: সিলেট সীমান্তে কেউ হতাহত না হলেও সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য সীমান্তে বিএসএফের প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ১৪ মে রাতে লালমনিরহাট সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে এক বাংলাদেশি নিহত হন। এর আগে ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় গুলিতে প্রাণ হারান আরও দুজন।
মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে অন্তত ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম সাড়ে চার মাসেই বিএসএফের গুলিতে কমপক্ষে ৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ৩ জনই মারা গেছেন গত দেড় সপ্তাহে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, “এত কম সময়ের ব্যবধানে একের পর এক গুলি ও মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে যে, ভারত সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রাখছে না।”
আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ‘পুশইন’ রাজনীতি এবং নতুন সংকট: সীমান্ত উত্তেজনার সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ভারতের অভ্যন্তর থেকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা বা ‘পুশইন’। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, গত বছর প্রায় দুই হাজার ব্যক্তিকে তারা বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন।
এরই মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। সেখানকার নতুন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নিয়েই বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কুমির ও সাপ ছাড়ার মতো বিতর্কিত পরিকল্পনার কথাও জানা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো, পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের আগে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানকার ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের বিজেপি বাংলাদেশি বলে দাবি করছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, আসামের মতো এই বিপুল সংখ্যক মানুষকেও বাংলাদেশ সীমান্তে পুশইন করার চেষ্টা চালাতে পারে পশ্চিমবঙ্গের নতুন প্রশাসন।
জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের তাগিদ: বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ভারত সফর করে সীমান্ত হত্যা বন্ধের তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার কোনো সুফল দেখা যাচ্ছে না।
এই প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, “ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালানোর পরও যেহেতু সীমান্ত হত্যা ও পুশইন থামছে না, সেজন্য এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত এই দ্বিপাক্ষিক সংকটের আন্তর্জাতিকীকরণ করা এবং সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাওয়া।”
যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, সীমান্ত হত্যাসহ সার্বিক দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে সীমান্ত ঘেঁষা মেদিনীপুর থেকে সিলেট সবখানেই এখন বিএসএফের আগ্রাসী নীতির কারণে তৈরি হয়েছে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :