ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

মহাখালীর জটলা কাটাতে এবার বসছে ‘এআই ক্যামেরা’, টার্মিনাল স্থানান্তরের চিন্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মে ২২, ২০২৬, ১০:৫১ এএম

মহাখালীর জটলা কাটাতে এবার বসছে ‘এআই ক্যামেরা’, টার্মিনাল স্থানান্তরের চিন্তা

গাজীপুর থেকে মাত্র এক ঘণ্টায় ছুটে আসা ‘গাজীপুর পরিবহন’-এর একটি বাস মহাখালীর আমতলী মোড়ের সিগন্যাল পার হতেই থমকে গেল। চাকার গতি যেন স্থবির। চালক আবদুস সালাম বিরক্ত মুখে স্টিয়ারিংয়ে চাপ দিয়ে বললেন, “সামনে মহাখালী টার্মিনাল পার হতে অন্তত আধাঘণ্টা লাগবে। এই জ্যামে পড়া প্রতিদিনের বাৎসরিক ঘটনা। চোখের সামনে দুই লেনের রাস্তা বাস মালিকরা দখল করে রাখছে, দেখার কেউ নাই।”

সালামের এই বিরক্তি কেবল একজন চালকের নয়, মহাখালী হয়ে যাতায়াতকারী লাখো নগরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তব চিত্র। তবে এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ট্রাফিক জটলা ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই (AI) ক্যামেরা’ প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে সক্ষমতার চেয়ে চার গুণ বেশি গাড়ির চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক এই টার্মিনালটি ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনের প্রধান সড়কের তিন লেনের দুই লেনই দিন-রাত দূরপাল্লার বাসের দখলে থাকে। দিনের পর দিন এভাবে সড়ককে ‘ডিপো’ বানিয়ে রাখায় মহাখালীতে যানজট কখনো কমে না। তদুপরি, মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে যে ইউটার্নটি তৈরি করা হয়েছিল, সেটি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ বাস মেরামতের খোলা গ্যারেজ। সড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে যত্রতত্র যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও প্রকট করে তুলছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান এই সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “এই মহাখালী বাস টার্মিনাল আসলে আমরা ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে পুরোপুরি কন্ট্রোল করতে পারছি না। এটি আমাদের জন্য একটি চরম জটিল ও স্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। টার্মিনালের উত্তর দিকে বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে, যেখান থেকে বাসগুলো তেল সংগ্রহ করার সময় সড়কে দীর্ঘ লাইন তৈরি করে। এতে তিন লেনের রাস্তা এক লেনে নেমে আসে।”

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, মহাখালীর এই নৈরাজ্য ঠেকাতে টার্মিনাল এলাকায় এআই ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে, যা আগামী রোববারের মধ্যে সম্পূর্ণ চালু হতে পারে। ইতোমধ্যেই রাজধানীর ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্রসিংয়ে এই আধুনিক ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

এই ক্যামেরাগুলোকে প্রযুক্তিগত ভাষায় বলা হচ্ছে ‘পিটিজেড ক্যামেরা’। এটি দূরবর্তী ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম থেকে ডানে-বামে, উপরে-নিচে ঘোরানো এবং জুম করা যায়। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ লঙ্ঘনকারী যানবাহনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করবে এই ক্যামেরা। বিশেষ করে বেআইনি পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং লেনের শৃঙ্খলা ভঙ্গের মতো ছয় ধরনের অপরাধের ভিডিও ও ছবি তুলে এটি সরাসরি পাঠিয়ে দেবে ডিএমপি সদর দপ্তরের ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে।

এই সফটওয়্যারের সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মূল সার্ভার যুক্ত থাকায় নিমিষেই গাড়ির মালিকের নাম ও বিস্তারিত তথ্য চলে আসবে এবং ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যারের’ মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা দিয়ে কপির ডাকযোগে মালিকের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পুলিশ কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, “তেল নেওয়ার লাইনের বাইরে রাস্তায় কোনো বাস দাঁড়ালেই এআইয়ের মাধ্যমে মামলা দেওয়া হবে। আমরা আশা করছি, এতে বড় একটা সুফল পাওয়া যাবে।”

মহাখালী টার্মিনালের যানজট নিরসনে বিগত দিনে নেওয়া সব উদ্যোগই খাতায়-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল টার্মিনালের ভেতর থেকে যাত্রী নিয়ে বাসগুলোকে ‘গেট লক’ বা দরজা বন্ধ করে বের হতে হবে। রেইলগেইট, আমতলী, চেয়ারম্যান বাড়ি, সৈনিক ক্লাব ও কাকলী পর্যন্ত দূরপাল্লার বাসগুলো মাঝপথে কোনো যাত্রী তুলতে পারবে না। কিন্তু মাত্র কয়েকদিন এই নিয়ম মানার পর পরিবহন খাত আবার পুরোনো রূপে ফিরে গেছে।

উদ্যোগটি সফল না হওয়ার বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “দূরপাল্লার যাত্রীরা মূলত টার্মিনাল পর্যন্ত হেঁটে যেতে চান না, তারা সড়কের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করেন এবং কন্ডাক্টরের সঙ্গে দরকষাকষি করেন। এছাড়া লোকাল বাসগুলোর যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করার কারণে ‘গেট লক’ পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে।” পাঁচ বছর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে আলোচনা না করেই টার্মিনালের সামনে যে ইউটার্নগুলো বানিয়েছিল, তা যানজটকে আরও বহুমুখী করে তুলেছে বলে মনে করেন অনেক ট্রাফিক কর্মকর্তা।

১৯৮৪ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৯ দশমিক ৪৪ একর জায়গার ওপর ডিএনসিসির অধীনে এই টার্মিনালটি নির্মিত হয়েছিল। বর্তমানে এর আয়তন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৫ একরে। ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং টাঙ্গাইল রুটের বাসের জন্য এই টার্মিনাল তৈরি হলেও বর্তমানে এখান থেকে উত্তরবঙ্গ, সিলেট এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ দেশের প্রায় সব রুটের বাস চলাচল করে। যমুনা সেতু ও দ্রুত যোগাযোগের সুবিধার কারণে গাবতলী ও সায়েদাবাদের বহু গাড়ি এখন মহাখালী থেকে ট্রিপ ছাড়ে।

ডিএনসিসির পরিবহন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক (মহাখালী বাস টার্মিনাল) মো. মেহেদী হাসান জানান, এই টার্মিনালের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা সাড়ে ৩০০ বাস হলেও বর্তমানে এখান থেকে দৈনিক ১ হাজার ২০০-র বেশি বাস চলাচল করছে। ৩ গুণেরও বেশি গাড়ির এই চাপ সীমিত জায়গায় নেওয়া অসম্ভব।

পরিস্থিতি সামাল দিতে টার্মিনালের ভেতরের দোতলা অবকাঠামো ভেঙে বহুতল টার্মিনাল ভবন নির্মাণের একটি প্রস্তাব রয়েছে। তবে পরিবহন মালিক ও ডিএনসিসি উভয় পক্ষই এখন টার্মিনালটি ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে।

মেহেদী হাসান বলেন, “মহাখালী টার্মিনালটি সরিয়ে পূর্বাচল এবং মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনের কাছাকাছি দিয়াবাড়ী-ভাটুলিয়া এলাকায় স্থানান্তরের ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ডটিও সরানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণসহ কোনো সিদ্ধান্তই এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”

যতদিন না এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া আলোর মুখ দেখছে, ততদিন এআই ক্যামেরার ‘ডিজিটাল ফাইন’ মহাখালীর এই দীর্ঘদিনের দীর্ঘশ্বাস কতটা লাঘব করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!