ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

এআই ক্যামেরায় মামলার ডিজিটাল ডালপালা, কিন্তু রাজপথ কি আসলেই সুশৃঙ্খল?

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম

এআই ক্যামেরায় মামলার ডিজিটাল ডালপালা, কিন্তু রাজপথ কি আসলেই সুশৃঙ্খল?

টাকার নোট আর কাগজের স্লিপ গুঁজে দিয়ে কিংবা ট্রাফিক সার্জেন্টের লাল খাতা এড়ানোর সনাতন দিন ফুরিয়ে আসছে ঢাকার রাজপথে। চলতি মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে রাজধানী ঢাকার বুকে পরীক্ষামূলকভাবে ডানা মেলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ই-প্রসিকিউশন সিস্টেম’। পাইলট প্রকল্প চালুর পর মাত্র কয়েক দিনেই এই অদৃশ্য ডিজিটাল ট্রাফিক পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে গিয়ে দুই হাজারেরও বেশি গাড়ি মামলার গ্যাঁড়াকলে পড়েছে।

বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার কিংবা বাংলামোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এখন চালকদের মধ্যে সিগন্যাল ও জেব্রা ক্রসিং মানার এক ধরনের বাধ্যবাধকতা দৃশ্যমান। তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির ‘ভিআইপি দাওয়াই’ ঢাকার গভীর ও জটিল ট্রাফিক ব্যাধি কতটা সারাবে, তা নিয়ে চালক, পুলিশ এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মনে খোদাই হয়ে আছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত ভিআইপি করিডোর এবং ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ প্রধান প্রধান সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি পয়েন্টে ১০৫টি উচ্চপ্রযুক্তির ‘পিটিজেড’ ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়েতে গাড়ির অতিরিক্ত গতি (ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটারের বেশি) শনাক্তের কাজ বেশ আগে শুরু হলেও মে মাসের ৭ তারিখ থেকে স্বয়ংক্রিয় এআই সফটওয়্যারের পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু হয়।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান জানান, বর্তমানে মূলত পাঁচ ধরনের অপরাধের জন্য এই ক্যামেরা তাৎক্ষণিক ছবি ও ভিডিও ধারণ করছে। এগুলো হলো-
১. রেড সিগন্যাল বা লাল বাতি অমান্য করা।
২. জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করে গাড়ি দাঁড় করানো।
৩. উল্টো পথে গাড়ি চালানো।
৪. নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া মাঝসড়কে গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা।
৫. বাম দিকের ফ্রি লেনটি ব্লক করে রাখা।

ভবিষ্যতে গাড়ি চালানোর সময় সিটবেল্ট না বাঁধা এবং মুঠোফোনে কথা বলার মতো অপরাধও এই এআই ক্যামেরার আওতায় আসবে।

উন্নত বিশ্বে ক্যামেরা অপরাধ শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে মালিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া বা সরাসরি ফাইন নোটিশ চলে গেলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটিতে এখনো ম্যানুয়াল বা হাতের ছোঁয়া রাখতে হচ্ছে।

অতিরিক্ত কমিশনার আনিছুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা ফুটেজ কালেক্ট করার পর ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের (টিটিইউ) সার্ভারে তা ম্যানুয়ালি বিশ্লেষণ করি। কারণ আমাদের বাস্তব কিছু সমস্যা আছে। ঢাকার বহু গাড়ির নাম্বার প্লেট অস্পষ্ট, ভাঙা কিংবা কাদা মাখা। সরাসরি নোটিশ পাঠালে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

ক্যামেরা থেকে ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও প্রমাণ হিসেবে সার্ভারে জমা থাকে। গাড়ি আইন অমান্য করলে বিআরটিএ-র সার্ভার থেকে মালিকের মোবাইল নম্বর নিয়ে একটি সতর্কবার্তা পাঠানো হয় এবং সশরীরে ট্রাফিক দপ্তরে হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ যায়। ১৫ দিনের মধ্যে জরিমানা দিয়ে দায়মুক্ত না হলে বিষয়টি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চলে যায়। পাশাপাশি ট্রাফিক আইন অমান্য করায় ইতিমধ্যে ১ হাজারের বেশি চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ‘পয়েন্ট’ কাটা শুরু হয়েছে।

এক্সপ্রেসওয়েতে এআই ব্যবহারের ফলে দৈনিক আড়াইশ থেকে তিনশ গতির আইন ভাঙার ঘটনা এখন মাত্র ২৫-৩০ টিতে নেমে এসেছে বলে পুলিশের দাবি। তবে ঢাকার সামগ্রিক ট্রাফিক পরিস্থিতিতে এই আংশিক সাফল্য কতটা টেকসই, তা নিয়ে সন্দিহান বিশিষ্ট যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক।

তার মতে, ঢাকার রাজপথের বিশৃঙ্খলা এতই জটিল যে শুধু ভালো ও ভিআইপি রাস্তায় এআই ব্যবহার করে ভাবমূর্তি রক্ষা করা যাবে না। ড. শামসুল হক বলেন, “সুশৃঙ্খল রাস্তায় এআই ডেটা খুব দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে। কিন্তু ঢাকার বাস্তব চিত্র হলো ভুয়া লাইসেন্স, এক প্লেটে ১০টা সিএনজি চলা এবং অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন খাত। বিজ্ঞান বলে, জটিল জিনিসটাকে আগে সমাধান করতে হয়। আপনি গুলিস্তান বা মিরপুরে যান—সেখানকার বিশৃঙ্খলা ঢাকার আসল চেহারা। গুলিস্তানে যদি এআই দিয়ে সফল হওয়া যায়, তবেই পুরো ঢাকায় সাফল্য আসবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আধুনিক বিজ্ঞানে টেকসই নগরী গড়তে ‘বাস’কে গণপরিবহনের মেরুদণ্ড বানাতে হবে। ছোট গাড়ি বা ইজিবাইককে ধাপে ধাপে সরাতেই হবে। এটা নিয়ে আবেগ দেখালে চলবে না, বিজ্ঞানের কোনো সমর্থন এখানে নাই।”

সড়কে ক্যামেরা চালু হওয়ার পর থেকে নিয়ম মেনে চলা সাধারণ চালক ও ট্যাক্সদাতাদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ২৫ বছর ধরে গাড়ি চালানো জুয়েল নামের এক চালক আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা লাইসেন্স করি, সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দেই। তাই আমাদের জন্য আইনের কোনো শেষ নাই। কিন্তু এই যে লাখ লাখ অনিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত রিকশা, লেগুনা আর ভুয়া ড্রাইভার ঘুরতাছে, তাদের ক্যামেরা কেমনে ধরব? ফুটপাত আর রাস্তা তো হকারদের দখলে, গাড়ি চালামু কোন দিক দিয়া?”

চালকদের মতে, আইন মানার সংস্কৃতি তৈরি হওয়া ভালো, কিন্তু লাইসেন্সবিহীন চালক ও অনিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিমানা আদায় করলে মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি-সবখানেই এখন তিন চাকার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের আধিপত্য। গুলিস্তান মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জানান, হকার এবং অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করাই ঢাকার সবচেয়ে কঠিন কাজ। এদের গতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না এবং এরা ট্রাফিক আইনের কোনো ভাষাই বোঝে না।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ট্রাফিক আইন অমান্য করায় গত চার মাসে প্রায় ৩৫ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা ডাম্পিং করা হয়েছে, অর্থাৎ দিনে গড়ে ৩০০টির মতো রিকশার তার কেটে বা হাওয়া ছেড়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরদিনই তারা আবার অলৌকিকভাবে রাস্তায় নেমে পড়ছে।

এই দুষ্টচক্রের বিষয়ে ট্রাফিক প্রধান আনিছুর রহমান জানান, অটোরিকশা এবং ইজিবাইকের এই তীব্র জটলা ও চলাচল নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে সক্রিয় ভাবনা-চিন্তা চলছে এবং খুব দ্রুতই সব পক্ষ মিলে একটি বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি বা এআই ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত ঢাকার রাস্তা থেকে অনিবন্ধিত যানবাহন দূর হচ্ছে, ফুটপাত দখলমুক্ত হচ্ছে এবং গণপরিবহন হিসেবে বড় বাসকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে, তত দিন এই এআই ক্যামেরার মামলা কেবল রাজস্ব আদায়ের খাত খোলার বাইরে ঢাকাবাসীকে যানজটমুক্ত কোনো সকাল উপহার দিতে পারবে না। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!