মা- একটি ছোট্ট শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বিশাল এক পৃথিবী। এই শব্দের উচ্চারণে যেমন কোমলতা আছে, তেমনি আছে আশ্রয়ের নিশ্চয়তা, নিরাপত্তার উষ্ণতা, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অগাধ স্রোত। মানুষ যখন এই পৃথিবীতে প্রথম কাঁদে, তখন যে হাতটি তাকে বুকের কাছে টেনে নেয়, যে চোখটি প্রথম তার দিকে অপার মমতায় তাকায়, যে হৃদয়টি প্রথম তার জন্য কাঁপে তিনি মা। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, আমাদের যতবার ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, ততবারই মায়ের নামটি যেন অদৃশ্য এক আলো হয়ে পথ দেখায়।
বিশ্ব মা দিবসে আমরা মায়ের কথা বলি, মাকে স্মরণ করি, মাকে ভালোবাসার কথা প্রকাশ করি। কিন্তু সত্যি বলতে, মায়ের প্রতি ভালোবাসা কি শুধু একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় শেষ হওয়ার বিষয়? যে মা নিজের ঘুম হারিয়ে সন্তানের জ্বর মাপে, যে মা নিজের ক্ষুধা চেপে সন্তানের পাতে খাবার তুলে দেন, যে মা নিজের ব্যথাকে আড়াল করে সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চান, তার ঋণ কি কোনোদিন শোধ করা যায়? মা এমন এক মানুষ, যিনি কষ্টকে কখনো কষ্ট বলে ডাকেন না; তিনি সেটাকে সন্তানের জন্য দায়িত্ব মনে করেন।
মায়ের ভালোবাসা শব্দে বোঝানো যায় না। তা বোঝা যায় ভোরের আগে উঠে সন্তানের জন্য প্রস্তুত হওয়া হাতে, রাত জেগে রাখা জোড়া চোখে, নিঃশব্দে দোয়া করা ঠোঁটে। মা যখন বলেন, “খেয়ে নিস”, তখন সেটি শুধু খাবারের কথা নয়; সেটি হলো নিরাপত্তার আহ্বান। মা যখন বলেন, “সাবধানে যা”, সেটি শুধু সাবধানবাণী নয়; সেটি হলো হৃদয়ের ভেতর লুকিয়ে থাকা ভয় আর মমতার মিলিত রূপ। মায়ের প্রতিটি কথা যেন সন্তানের জীবনের জন্য একেকটি আশীর্বাদ।
আমরা অনেক সময় মাকে অবহেলা করি জেনেশুনে নয়, ভুলে গিয়ে। সন্তান বড় হয়, ব্যস্ত হয়, দূরে সরে যায়, আর সেই সঙ্গে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময়ও কমে যায়। তখন মা হয়তো অভিযোগ করেন না, কিন্তু বুকের ভেতর নিঃশব্দে জমে থাকে অভিমান। মা কখনো বলেন না, “আমাকে সময় দাও”; তিনি শুধু অপেক্ষা করেন। সন্তানের একটা ফোনকল, একটা খোঁজ, একটা “ভালো আছ তো?” এতেই তার দিনের আলো জ্বলে ওঠে। অথচ আমরা কত সহজে ভুলে যাই, এই মানুষটি একসময় আমাদের জন্য নিজের শরীর, ঘুম, আর স্বপ্ন সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন।
মা মানে শুধু জন্মদাত্রী নন। মা মানে সাহস। মা মানে ধৈর্য। মা মানে নিঃশব্দ ত্যাগ। মা মানে সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু, প্রথম আশ্রয়। পৃথিবীর সব সাফল্যের পেছনে, সব অর্জনের পেছনে, সব দাঁড়িয়ে যাওয়ার পেছনে কোথাও না কোথাও মায়ের অবদান লুকিয়ে থাকে। সন্তানের প্রথম অক্ষর শেখা থেকে শুরু করে প্রথম ব্যর্থতার মুখোমুখি হওয়া পর্যন্ত, মা পাশে থাকেন। তিনি শিখিয়ে দেন কীভাবে ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অন্ধকারের ভেতরেও আশা জাগিয়ে রাখতে হয়।
একজন মা নিজের সন্তানকে কেবল বড় করেন না, তিনি মানুষের মতো মানুষ করে তোলার লড়াই করেন। এই লড়াইয়ে তিনি নিজেকে হারিয়ে দেন, তবু অভিযোগ করেন না। সন্তানের সামান্য হাসি তাঁর সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। সন্তানের সাফল্য তাঁর নিজের বিজয় হয়ে ওঠে। আর সন্তানের ব্যথা? সেটি যেন তার নিজের শরীরেই বাজে। এমন তীব্র, এমন গভীর, এমন অবর্ণনীয় ভালোবাসা পৃথিবীর আর কোথাও খুব কমই দেখা যায়।
বিশ্ব মা দিবস তাই শুধু ফুল দেওয়ার দিন নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও দিন। আমরা কি সত্যিই মাকে সময় দিচ্ছি? তাঁর কথা মন দিয়ে শুনছি? তাঁর শরীর-মন কেমন আছে, সেটা খেয়াল রাখছি? নাকি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে দায়িত্ব শেষ করছি? মা কোনো ছবির ফ্রেমে রাখা স্মৃতি নন; তিনি জীবন্ত, শ্বাস নেওয়া, ক্লান্তি-বোঝা, ভালোবাসায় ভরা এক মানবী। তাঁকে ভালোবাসতে হলে তাঁর পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁর কষ্ট ভাগ করে নিতে হবে, তাঁর একাকিত্ব কমাতে হবে।
আজকের এই দিনে মায়ের প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা হতে পারে তাঁকে একটু বেশি সময় দেওয়া। তাঁকে শুধু “মা” বলে ডাকা নয়, তাঁর মনটাকে অনুভব করা। তাঁর মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্লান্তি দেখা। তাঁর কণ্ঠে জমে থাকা অভিমান শুনতে পাওয়া। তাঁর নিঃশব্দ ত্যাগের মূল্য বোঝা। কারণ মা কখনো নিজের জন্য কিছু চান না; তিনি চান সন্তান ভালো থাকুক, সম্মান পাক, নিরাপদ থাকুক, মানুষ হোক।
মা না থাকলে জীবন হয়তো চলবে, কিন্তু তার উষ্ণতা থাকবে না।
মা না থাকলে পৃথিবী থাকবে, কিন্তু ঘর থাকবে না।
মা না থাকলে মানুষ বড় হবে, কিন্তু ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা থেকে যাবে, যা কোনোদিন পূরণ হয় না।
মা এমন এক নাম, যা উচ্চারণ করলেই বুকের ভেতর নরম হয়ে যায়।
মা এমন এক ছায়া, যা রোদ, ঝড়, ক্লান্তি সবকিছুর মাঝেও আশ্রয় দেয়।
মা এমন এক প্রার্থনা, যা আমাদের জন্মের আগে থেকে শুরু হয়ে আজও চলতে থাকে।
বিশ্ব মা দিবসে তাই শুধু বলি না মা, তুমি ভালো থেকো। আমরা প্রতিজ্ঞাও করি যে হৃদয় আমাদের প্রথম ভালোবাসা শিখিয়েছে, সেই হৃদয়কে আমরা কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট দেব না। কারণ মায়ের ভালোবাসা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য আর সেই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা চিরকাল ঋণী।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :