ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Daily Global News

জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের যে বার্তা, তার পরীক্ষা ঘরের মাটিতে

আহমেদ শাহেদ

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

জাতিসংঘে তারেক রহমানের ভাষণ: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের যে বার্তা, তার পরীক্ষা ঘরের মাটিতে

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ কখনোই শুধু একটি বক্তৃতা নয়। সেটি একই সঙ্গে রাষ্ট্রের অবস্থান, সরকারের অগ্রাধিকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণটিকেও তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রায় পুরো ভাষণজুড়েই ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন, গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রত্যাশার একটি সমন্বিত চিত্র।

সবচেয়ে আগে যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তিনি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তাঁর আন্তর্জাতিক বক্তব্যের ভিত্তি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করার পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এরপর তিনি বলেছেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর বাংলাদেশ ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ হয়েছে এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে বলেছেন, জনগণই সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

এখানে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেশের ক্ষমতার পরিবর্তনকে কেবল একটি সরকার পরিবর্তন হিসেবে উপস্থাপন করেননি, বরং সেটিকে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার ধারার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের নতুন সরকারের পরিচয় তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন গণতন্ত্র, জনগণের ক্ষমতা এবং জবাবদিহিতার ওপর দাঁড় করিয়ে।

কিন্তু এই জায়গাটিই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাও তৈরি করে। কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে গণতন্ত্রের অঙ্গীকার ঘোষণা করা তুলনামূলকভাবে সহজ; সেই অঙ্গীকারকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে স্থায়ী করা কঠিন। জাতিসংঘের মঞ্চে উচ্চারিত কথাগুলোর প্রকৃত মূল্য তাই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভেতরের বাস্তবতায়।

ভাষণের আরেকটি শক্তিশালী দিক ছিল বিশ্বরাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান। সংঘাতের সমাধানে আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদার কথা বলেছেন। অস্ত্রের বদলে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

এটি বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত বহুপাক্ষিক কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রশ্নে কোনো সামরিক শক্তির ভাষা নয়, বরং কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশের ভূমিকা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারী সদস্যদের অংশগ্রহণের কথাও এসেছে। এটি নিছক গর্বের বিষয় হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি আন্তর্জাতিক ইস্যু নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গা সংকট। নয় বছরের বেশি সময় ধরে ১২ লাখের বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, সংকটের উৎস যেহেতু মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে। নিরাপদ প্রত্যাবাসনকেই তিনি সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এই বক্তব্যের কূটনৈতিক গুরুত্ব অনেক। বাংলাদেশ শুধু আন্তর্জাতিক সহায়তা চায়নি, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংকটের মূল কারণের দিকে তাকানোর আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য বাস্তব প্রয়োজন, কারণ প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া যত দীর্ঘ হবে, বাংলাদেশের ওপর মানবিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপও তত বাড়বে।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও ভাষণে বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে বেশি। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী বৈশ্বিক পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।

এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কিছু লক্ষ্যও যুক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, পরিচ্ছন্ন ও সৌর জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং পানি ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কথা বলেছেন। এগুলো নিঃসন্দেহে বড় লক্ষ্য। কিন্তু বড় লক্ষ্য ঘোষণার পর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বাস্তবায়নের কাঠামো। কত টাকা লাগবে, কোথা থেকে অর্থ আসবে, কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেবে, কীভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং ফলাফল কীভাবে পরিমাপ করা হবে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তরই শেষ পর্যন্ত এসব পরিকল্পনার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।

অর্থনীতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’ বা ৩-আর কৌশল বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের স্টার্টআপ বরাদ্দের কথাও তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশকে উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেছেন।

বাংলাদেশের জন্য এই অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে শুধু জনসংখ্যা হিসেবে নয়, উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষা, দক্ষতা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, গবেষণা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে। শুধু অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না, সেই অর্থ প্রকৃত উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক সুরক্ষা এবং শিক্ষা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী একাধিক পরিকল্পনার কথা বলেছেন। শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ এবং আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা তাঁর বক্তব্যে এসেছে।

এখানেও মূল প্রশ্ন অর্থের পরিমাণের পাশাপাশি অর্থের ব্যবহার। একটি দেশের শিক্ষা বাজেট বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, কারিগরি দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীর বাস্তব সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কতটা কাজে লাগছে।

প্রধানমন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিকাশের কথাও বলেছেন। বিশেষ করে তিনি চেয়েছেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি না করে। এ বক্তব্য বর্তমান বিশ্বের জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ডিজিটাল বৈষম্যের পরবর্তী ধাপ যদি হয় এআই বৈষম্য, তাহলে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।

LDC উত্তরণ নিয়েও প্রধানমন্ত্রী ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অর্থায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত বাস্তব একটি প্রশ্ন, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন অবস্থানের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাবে।

সবশেষে ভাষণের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাক্যটি সম্ভবত ছিল, ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’। এই বাক্যের মধ্যে তিনি যে রাষ্ট্রের কথা বলেছেন, সেটি কেবল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নয়। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেছেন যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে পারবে। তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ তৈরি করার সুযোগ পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগোতে পারবে এবং শিশুরা নিজেদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।

এই জায়গাতেই জাতিসংঘের ভাষণটি বাংলাদেশের জন্য একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দলিল হয়ে ওঠে।
কারণ একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু তার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দিয়ে তৈরি হয় না। সেটি তৈরি হয় দেশের মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে। মানুষ রাষ্ট্রের সেবা পাচ্ছে কি না, বিচার পাচ্ছে কি না, নিরাপদে মত প্রকাশ করতে পারছে কি না, কর্মসংস্থান পাচ্ছে কি না, নারী ও শিশু নিরাপদ কি না, বিনিয়োগকারী আস্থা পাচ্ছে কি না, প্রান্তিক মানুষ উন্নয়নের অংশীদার হচ্ছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরেই একটি দেশের প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়।

জাতিসংঘে তারেক রহমান বাংলাদেশের জন্য যে চিত্রটি তুলে ধরেছেন, সেটি মূলত একটি প্রত্যাশার বাংলাদেশ। গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, মানবিক রাষ্ট্র, শান্তিপূর্ণ বিশ্ব, নিরাপদ প্রত্যাবাসন, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং প্রযুক্তির ন্যায্য ব্যবহার, সবকিছুকে তিনি একই কাঠামোর মধ্যে এনেছেন।
এখন সেই কাঠামোর বাস্তব পরীক্ষা বাংলাদেশে।

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ ভবনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে শব্দগুলো উচ্চারিত হয়েছে, সেগুলো কতটা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় পরিণত হবে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ বিশ্বমঞ্চে একটি রাষ্ট্র তার স্বপ্নের কথা বলতে পারে, কিন্তু সেই স্বপ্নের সত্যতা প্রমাণ করতে হয় নিজের মানুষের সামনে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’ যদি শুধু একটি বক্তব্যের শেষ বাক্য না হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব নীতি হয়ে ওঠে, তবেই জাতিসংঘের মঞ্চে উচ্চারিত এই কথাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অর্থবহ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!