ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
Daily Global News

ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি নগর শাসনের আয়না

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০২:৪২ পিএম

ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি নগর শাসনের আয়না

একসময় বর্ষাকাল এলেই ডেঙ্গু নিয়ে কিছুদিন আলোচনা হতো। মশা নিধনের অভিযান চলত, প্রচারপত্র বিলি হতো, হাসপাতালগুলো প্রস্তুতি নিত। শীত এলে আতঙ্ক কমে যেত এবং বিষয়টিও ধীরে ধীরে জনপরিসর থেকে হারিয়ে যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা আমাদের একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছে: ডেঙ্গু এখন কেবল মৌসুমি স্বাস্থ্যসমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি কঠিন পরীক্ষা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৭৭ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২৩৯-এ পৌঁছেছে। শুধু বছরের ৩৯তম সপ্তাহেই ছয় হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর এক দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৯৪২ জন, মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। সংখ্যাগুলো প্রতিদিন বদলাচ্ছে; কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, উদ্বেগে কাটানো রাত, চিকিৎসার ব্যয় এবং কখনো অপূরণীয় শোক। 
 

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পরিস্থিতিই ছিল উদ্বেগজনক। ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ৫৩ হাজার ৫৭০ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সেদিন এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৩৩, যা তখন পর্যন্ত বছরের সর্বোচ্চ। এর দুই সপ্তাহের মধ্যেই মোট রোগীর সংখ্যা ৭৭ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া দেখায়, সংক্রমণ কত দ্রুত ছড়িয়েছে।


দায় শুধু মশার নয়: ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা। কিন্তু মশা নিজে জলাবদ্ধতা তৈরি করে না, নালা বন্ধ করে না, ভবনের ছাদে পরিত্যক্ত পাত্র ফেলে রাখে না কিংবা নির্মাণাধীন ভবনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পানি জমিয়ে রাখে না। অর্থাৎ জীবাণু ও বাহক প্রাকৃতিক হলেও এর বিস্তারের অনুকূল পরিবেশের একটি বড় অংশ মানুষ ও অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি।

ঢাকার কোনো এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। সেই পানির কিছু অংশ দৃশ্যমান, আর কিছু থেকে যায় বাড়ির ছাদ, পার্কিং এলাকা, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব, নির্মাণসামগ্রী ও অরক্ষিত জলাধারে। এডিস মশার প্রজননের জন্য বিশাল জলাশয় প্রয়োজন হয় না; অল্প পরিষ্কার পানিই যথেষ্ট। ফলে বড় নালা পরিষ্কার করলেও বাড়ি, ভবন ও পাড়া পর্যায়ের ছোট প্রজননস্থল ধ্বংস করা না গেলে অভিযান অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

এখানেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ধারণায় পরিবর্তন দরকার। ধোঁয়া ছড়ানো বা ওষুধ ছিটানো দৃশ্যমান বলে নাগরিকদের কাছে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ বলে মনে হয়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারার পাশাপাশি লার্ভার উৎস শনাক্ত ও ধ্বংস না করলে একই এলাকায় কয়েক দিনের মধ্যে আবার মশা বাড়তে পারে। কত লিটার ওষুধ ছিটানো হলো, সেটি নয়; কতটি প্রজননস্থল স্থায়ীভাবে অপসারণ করা গেল, সেটিই সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত।

স্বাস্থ্যসংকটের সঙ্গে জলবায়ু ও নগরায়নের সম্পর্ক: বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তারকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তিত ধরন মশার প্রজনন ও রোগ সংক্রমণের সময়কালকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল-জলাধার সংকোচন, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব ঝুঁকিকে আরও বাড়ায়।

বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু ও উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ু ঝুঁকিতে অত্যন্ত অরক্ষিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ মিটারের কম উচ্চতায় এবং নদী ও বৃষ্টির পানিতে প্লাবনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অর্থাৎ ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা কোনো বিচ্ছিন্ন নগর সমস্যা নয়; পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগর পরিকল্পনা না বদলালে এটি আরও জটিল হতে পারে। 
বিশ্বব্যাংক

২০২৬ সালের আরবান ডায়ালগে জলবায়ু সহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর গড়তে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে ১৬ দফা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নগর নীতি, স্থানিক পরিকল্পনা আইন এবং জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা কার্যকর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে নীতি ও পরিকল্পনার ঘাটতির চেয়ে বড় সমস্যা প্রায়ই হয় বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও জবাবদিহির ঘাটতি।

হাসপাতাল যেন শেষ প্রতিরক্ষা না হয়: ডেঙ্গু পরিস্থিতি খারাপ হলে আমাদের মনোযোগ সাধারণত হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক ও স্যালাইনের দিকে যায়। এগুলো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু হাসপাতাল হচ্ছে প্রতিরোধব্যবস্থার শেষ স্তর। প্রতিদিন হাজারের কাছাকাছি কিংবা তার বেশি রোগী ভর্তি হতে থাকলে সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়বে।

এ চাপ শুধু শয্যার ওপর পড়ে না। ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা, রক্তের উপাদান, নিবিড় পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল এবং রোগীর স্বজনদের সঠিক পরামর্শ - সবকিছুর ওপর একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি হয়। সরকারি হাসপাতালে ভিড় বাড়লে অনেক পরিবার বেসরকারি চিকিৎসার দিকে যায়। তখন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চিকিৎসাব্যয়ের বাড়তি বোঝা পড়ে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই ব্যয় আরও কষ্টকর। আগস্টে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ হলেও তা এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও বলেছে, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি পরিবারের একজন সদস্য ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পরীক্ষা, ওষুধ, যাতায়াত, হাসপাতাল এবং কর্মদিবস হারানোর সম্মিলিত খরচ পরিবারটিকে ঋণ বা সঞ্চয় ভাঙার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কেবল স্বাস্থ্য রক্ষার কাজ নয়; এটি দারিদ্র্য প্রতিরোধ এবং সামাজিক সুরক্ষারও অংশ।

সমন্বয়হীনতার মূল্য দেয় নাগরিক: একটি শহরের নালা এক প্রতিষ্ঠানের অধীনে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অন্য প্রতিষ্ঠানের, খাল ও জলাশয় আরেক সংস্থার, নির্মাণ অনুমোদন ভিন্ন কর্তৃপক্ষের এবং রোগীর তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে। কোনো এলাকায় ডেঙ্গু বাড়লে এসব প্রতিষ্ঠান একই মানচিত্র, একই তথ্য এবং একই কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ না করলে ফল পাওয়া কঠিন।

সমন্বয় সভা করাই যথেষ্ট নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক দৈনিক রোগীর সংখ্যা, সম্ভাব্য প্রজননস্থল, জলাবদ্ধ এলাকা এবং চলমান নির্মাণকাজের তথ্য একত্র করে ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করা দরকার। যে ওয়ার্ডে সংক্রমণ বাড়বে, সেখানে দ্রুত সমন্বিত দল পাঠাতে হবে। তারা বাসাবাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন, লার্ভা পরীক্ষা, বর্জ্য অপসারণ, রোগীর পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-রেফারেল একসঙ্গে সম্পন্ন করবে।

এ কাজে তথ্য প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ। কোন এলাকায় কত রোগী, কোথায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কতটি প্রজননস্থল পাওয়া গেছে এবং পরবর্তী পরিদর্শন কবে এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে নাগরিকেরা সতর্ক হতে পারবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি বাড়বে।

জরিমানা নয়, আচরণ পরিবর্তন চাই: ডেঙ্গুর মৌসুমে প্রায়ই বাড়ির আঙিনা বা নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমে থাকার কারণে জরিমানা করা হয়। আইন প্রয়োগ প্রয়োজন, বিশেষ করে বারবার সতর্ক করার পরও যারা ঝুঁকি তৈরি করেন তাদের ক্ষেত্রে। তবে শুধু জরিমানা করে দীর্ঘমেয়াদি আচরণ পরিবর্তন সম্ভব নয়।

একজন নাগরিককে জানতে হবে কোথায় পানি জমতে পারে, কত দিন পরপর তা পরিষ্কার করতে হবে এবং জ্বর হলে কখন হাসপাতালে যেতে হবে। স্কুল, মসজিদ, বাজার, কারখানা, পরিবহনকেন্দ্র ও আবাসিক সমিতিকে আলাদা দায়িত্ব দিতে হবে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন নির্দিষ্ট সময়ে প্রত্যেকে নিজের বাড়ি ও কর্মস্থলে দশ মিনিট ধরে পানি জমার স্থান পরীক্ষা করতে পারেন। এটি প্রচারের স্লোগান না হয়ে নিয়মিত সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হওয়া দরকার।

তবে সব দায় নাগরিকের ঘাড়ে চাপানোও অন্যায়। একজন বাসিন্দা নিজের ফুলের টব পরিষ্কার করতে পারেন, কিন্তু তিনি শহরের বন্ধ নালা, দখল হওয়া খাল কিংবা অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজের সমাধান করতে পারবেন না। নাগরিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে পরস্পরের বিকল্প নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।

এখন যা করা জরুরি: প্রথমত, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সারা বছরের কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে। রোগী বাড়ার পর অভিযান নয়; বরং শুষ্ক মৌসুম থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত, নালা ও জলাধার পরিষ্কার এবং নির্মাণস্থল পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ওয়ার্ডভিত্তিক রোগ নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও পরীক্ষাগারের তথ্য দ্রুত একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়াতে হবে। কোন এলাকায় কোন ধরনের মশা বাড়ছে, ব্যবহৃত কীটনাশক কতটা কার্যকর এবং মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হচ্ছে কি না - বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

চতুর্থত, নগরের প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পে পানি নিষ্কাশন ও মশা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা দরকার। নিয়ম ভাঙলে জরিমানার পাশাপাশি কাজ সাময়িক বন্ধ করার বিধান কার্যকর হতে পারে।

পঞ্চমত, হাসপাতালগুলোতে অভিন্ন চিকিৎসা নির্দেশিকা, দ্রুত রেফারেল এবং প্রয়োজনীয় উপকরণের মজুত নিশ্চিত করতে হবে। রোগী ও স্বজনদের জন্য সহজ ভাষায় সতর্কসংকেত জানানো প্রয়োজন, যাতে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিকিৎসা নেওয়া যায়।

সবশেষে, সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতি বদলাতে হবে। কতটি অভিযান বা সভা হয়েছে, তা প্রশাসনিক হিসাব। রোগী ও মৃত্যু কতটা কমল, কোন এলাকায় পুনরায় প্রজননস্থল তৈরি হলো না এবং নাগরিক কত দ্রুত সেবা পেলেন এগুলোই জনস্বাস্থ্যের হিসাব।

ডেঙ্গু আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, একটি শহর শুধু সড়ক, উড়ালসেতু ও ভবনের সমষ্টি নয়। নাগরিক নিরাপদে শ্বাস নিতে পারবেন কি না, বৃষ্টির পর সড়ক ডুবে যাবে কি না এবং জ্বর হলে সময়মতো চিকিৎসা পাবেন কি না এসব দিয়েও উন্নত শহরকে বিচার করতে হয়।

মশা ছোট প্রাণী, কিন্তু তার বিস্তার আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে বড় করে দেখিয়ে দেয়। সেই আয়নায় নিজেদের ব্যর্থতা দেখতে সাহসী না হলে প্রতি বছর আমরা একই শোক, একই অভিযান এবং একই প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি দেখব। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তাই শুধু মশা মারা নয়, অবহেলার সংস্কৃতিও বদলাতে হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!