ঢাকা রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News

জোটের আমন্ত্রণ, বিবেকের পরীক্ষা: মক্কা চুক্তি ও বাংলাদেশের নিরপেক্ষতার সংকট

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৭, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

জোটের আমন্ত্রণ, বিবেকের পরীক্ষা: মক্কা চুক্তি ও বাংলাদেশের নিরপেক্ষতার সংকট

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে দৃশ্যপট এখন অভাবনীয় দ্রুতগতিতে বদলাচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে বিশ্বব্যবস্থা যে এককেন্দ্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা এখন বহুমুখী মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ সর্বত্রই নতুন নতুন কৌশলগত জোট বা বলয় তৈরি হচ্ছে। ঠিক এমন একটি অস্থির, পরিবর্তনশীল ও চরম প্রতিযোগিতামূলক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ভূরাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা চুক্তি’ নামের ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার জন্য ঢাকার কাছে যে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এসেছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিমূলকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যখন গণমাধ্যমকে জানান যে, সরকার এই জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে ‘ইতিবাচক’ হিসেবেই দেখছে এবং খোদ সরকারপ্রধানকে এই চুক্তিতে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তখন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে গভীর চিন্তার উদ্রেক হয়। ন্যাটোর ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’ বা কালেকটিভ ডিফেন্স নীতির আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল কথা হলো জোটের কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে।

এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ অবস্থানের খোলস ছেড়ে বাংলাদেশ কি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কোনো সামরিক ব্লকে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত? এই সিদ্ধান্ত আমাদের অর্থনীতি, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক কূটনীতিতে ঠিক কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে? এটি কি কেবলই একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত, নাকি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা আর অস্তিত্বের এক চূড়ান্ত পরীক্ষা?

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’। এই একটি মাত্র বাক্যের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ গত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটি চমৎকার ও নিরাপদ ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, রাশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সবার সঙ্গেই বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে শুধু অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে।

কোনো সামরিক ব্লকে সরাসরি যুক্ত না হওয়ার কারণেই বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে একটি নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে পেরেছে। আমরা পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে, উত্তর ও দক্ষিণের সঙ্গে সমানতালে সম্পর্ক রেখেছি। এই ভারসাম্যের কারণেই আমরা বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটের সময়ও নিরাপদ থেকেছি, বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছি এবং আমাদের বাণিজ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে নিতে পেরেছি।

কিন্তু মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাবটি আমাদের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমীকরণ হাজির করেছে। সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি ও শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ, তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী এক প্রবল সামরিক পরাশক্তি এবং পাকিস্তান এই অঞ্চলের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ। এই তিন দেশের সমন্বয়ে গঠিত জোটটি মূলত একটি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বা সুন্নি সামরিক বলয়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি সুন্নি মুসলিম হওয়ায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে আমাদের গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নৈকট্য থাকায়, এই জোটে যুক্ত হওয়ার একটি প্রবল আবেগীয় ও মনস্তাত্ত্বিক আকর্ষণ রয়েছে। অনেকেই হয়তো ভাবছেন, একটি শক্তিশালী সামরিক বলয়ের ছায়া পেলে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। তবে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে বাস্তবতার হিসাব মেলানো অনেক বেশি জরুরি।

সামরিক ও ভূরাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের আগে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি যে দিকটিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন, তা হলো আমাদের ভঙ্গুর অথচ সম্ভাবনাময় অর্থনীতি। একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই শুধু কূটনীতিকদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের আলোচনার বিষয় নয়। এটি কোটি মানুষের রুটি-রুজি, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি দুটি- তৈরি পোশাক (আরএমজি) রপ্তানি এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত লাখ লাখ প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অন্যতম প্রধান উৎস। এই রেমিট্যান্স শুধু সংখ্যা নয় এটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন মায়ের ওষুধ কেনার টাকা, সন্তানের স্কুলের বেতন, একটি পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল। সেই দিক থেকে সৌদি আরব বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

কিন্তু অন্যদিকে, আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের বিশাল একটি অংশ নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারের ওপর। প্রতিটি শার্ট, প্রতিটি প্যান্ট যা কারখানায় সেলাই হয়, তার পেছনে আছে একজন শ্রমিকের ঘাম আর বেঁচে থাকার স্বপ্ন। পশ্চিমা বিশ্ব কখনোই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো সামরিক ব্লকের উত্থানকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে না। বিশেষ করে এমন একটি বলয়, যেখানে তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশ রয়েছে, যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সম্পর্ক বেশ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ যদি আবেগের বশে মক্কা চুক্তিতে সই করে, তবে পশ্চিমা দেশগুলো এটিকে তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এর ফলে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা বাতিল, বাণিজ্যে কড়াকড়ি আরোপ কিংবা পশ্চিমা বিনিয়োগ প্রত্যাহারের মতো ভয়াবহ অর্থনৈতিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা আসতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সামরিক চুক্তির চেয়ে আমাদের এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ অনেক বেশি জরুরি। পশ্চিমা বাজার হারালে দেশের লাখ লাখ পোশাকশ্রমিক মুহূর্তের মধ্যে বেকার হয়ে পড়বেন, যা এক অবর্ণনীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দেবে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ধাক্কাটি আসবে নিকট প্রতিবেশী ভারতের তরফ থেকে। চুক্তির অন্যতম প্রধান অংশীদার হলো পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র, যাকে ভারত ঐতিহাসিকভাবে তার এক নম্বর জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। পাকিস্তানের সঙ্গে একই সামরিক জোটে বাংলাদেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবে এমন দৃশ্যকল্প নয়াদিল্লির জন্য চরম অস্বস্তিকর।

ভারত ঐতিহাসিকভাবেই তার চারপাশের দেশগুলোতে অন্য কোনো শক্তিশালী সামরিক বলয়ের উপস্থিতি মেনে নিতে নারাজ। বর্তমানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এমনিতেই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল সময় পার করছে। পটপরিবর্তনের পর শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ, সীমান্ত হত্যা এবং অমীমাংসিত পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের শীতল স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে, তবে ভারত এটিকে সরাসরি ‘ভারতবিরোধী বলয়’ হিসেবেই আখ্যায়িত করবে।

এর ফলে সীমান্ত বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি সরবরাহ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে ভারত এমন সব বাধা তৈরি করতে পারে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক ও মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করবে। একটি ছোট ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য এতগুলো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে একসঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করা মোটেও সহজ কাজ নয়। এটি যেন একটি খাদের ওপর টানটান দড়িতে হাঁটার মতো একদিকে সামান্য হেলে পড়লেই অতল গহ্বরে পতনের ঝুঁকি।

মক্কা চুক্তির পটভূমি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, বিশেষ করে ইরানের প্রভাব বিস্তার এবং তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর (যেমন: হুথি বা হিজবুল্লাহ) সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলার জন্যই মূলত এই সামরিক বলয় তৈরি করা হয়েছে।

এই চুক্তির ‘যৌথ প্রতিরক্ষা’ ধারার অর্থ অত্যন্ত ভয়ংকর। এর মানে হলো, যদি সৌদি আরবের কোনো তেলক্ষেত্রে কিংবা তুরস্ক বা পাকিস্তানের সীমান্তে কোনো হামলা হয়, তবে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকেও তার সামরিক শক্তি দিয়ে তাদের রক্ষায় এগিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, যার মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সে কি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরুভূমিতে কোনো ছায়াযুদ্ধে নিজেদের সৈন্য পাঠাতে প্রস্তুত?

ভাবুন তো, একটি যুদ্ধ যা আমাদের ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, সেই যুদ্ধে আমাদের তরুণ সৈনিকদের রক্ত ঝরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলা কতটা যুক্তিসংগত? সুন্নি-শিয়া মেরুকরণের এই যুদ্ধে জড়ালে ইরানসহ অনেক দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের দেশে এখনো অনেক মানুষ দুবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খায়। অনেক গ্রামে এখনো নাগরিক সুবিধা পৌঁছায়নি। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, দূরের কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নেওয়া চরম অবিবেচকের মতো কাজ হবে।

এই পুরো আলোচনায় একটি জিনিস লক্ষণীয় সাধারণ মানুষের মতামত এখানে কোথায়? এত বড় একটি সিদ্ধান্ত, যা দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে, তা নিয়ে কি জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে? সংসদে বা নাগরিক সমাজে কি এই বিষয়ে কোনো উন্মুক্ত বিতর্ক হয়েছে? নাকি এটি শুধু কূটনৈতিক করিডোরে বসে গুটিকয়েক মানুষের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হয়ে যাবে?

গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জনমত যাচাই করা অপরিহার্য। কারণ যুদ্ধ বাধলে বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এলে তার মাসুল গুনবে সাধারণ মানুষের সন্তান, রাজনীতিবিদরা নন। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে না খেয়ে মরবে সাধারণ শ্রমিক, সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণি নয়।

আমাদের বিবেক বলে, শান্তি আর উন্নয়নই হওয়া উচিত আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য যুদ্ধ বা সামরিক শক্তির প্রদর্শনী নয়। আমরা এমন একটি জাতি, যারা নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন করেছি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। আমরা জানি যুদ্ধের কষ্ট কতটা গভীর, কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও অমানবিক। তাই যখন কোনো সামরিক জোটে যোগদানের প্রস্তাব আসে, তখন আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আমরা কখনো যুদ্ধ চাইনি, আমরা চেয়েছি শান্তি। কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিই, তবে সেটি হবে আমাদের রক্তস্নাত ইতিহাসের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত মক্কা চুক্তিতে আমন্ত্রণ পাওয়াটা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্বেরই একটি বড় স্বীকৃতি। কিন্তু এই হাতছানির পেছনে লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গভীর ও জটিল ফাঁদ। আবেগতাড়িত হয়ে কিংবা নিছক ধর্মীয় নৈকট্যের ভিত্তিতে এত বড় একটি সামরিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন হবে না।

কূটনৈতিক প্রজ্ঞা মানে শুধু আসা আমন্ত্রণ গ্রহণ করা নয়; বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করে এগোনো। ক্ষণিকের কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের বিনিময়ে যদি আমরা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে ফেলি, তবে সেটি হবে এক আত্মঘাতী ভুল। আমাদের নীতিনির্ধারকদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এই আমন্ত্রণের সুবিধা ও ঝুঁকির চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। পশ্চিমা পোশাক বাজার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং পরাশক্তিগুলোর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ যেন এমন কোনো ফাঁদে পা না দেয়, যার দায়ভার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আজীবন বহন করতে হয়। আমাদের বিবেক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শান্তি, মানবকল্যাণ এবং জোটনিরপেক্ষ অর্থনৈতিক কূটনীতিই হোক আগামী দিনের বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক। এই মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হলে, কালের কাঠগড়ায় আমাদের সকলকেই এর চরম মূল্য চোকাতে হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!