ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩
Daily Global News

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বিতর্ক: অনুপ্রবেশ, অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের রাজনীতি

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৪, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বিতর্ক: অনুপ্রবেশ, অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত শব্দগুলোর একটি হলো ‍‍`গুপ্ত‍‍` বা ‍‍`সুপ্ত‍‍` রাজনীতি। কে কোন দলের হয়ে গোপনে কাজ করছেন, কার রাজনৈতিক আনুগত্য আসলে কোথায়, কে কার দলে অনুপ্রবেশকারী আর কে অন্য দলের প্রক্সি হয়ে মাঠে নেমেছেন-এমন সব নানা চাঞ্চল্যকর তত্ত্বে সরগরম দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই বিতর্ক যেন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং একে অপরকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা রাজনীতিতে গভীর অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে।

সম্প্রতি এই বিতর্ক নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করে যখন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আবারও অভিযোগ করেন যে, গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে দেশের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র চলছে। গত ১ অক্টোবর ফেনীতে এক বিশাল জনসভায় তিনি প্রকাশ্যে কারও নাম না নিলেও তার নিশানায় যে জামায়াতে ইসলামী ছিল, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বক্তব্যে বলেন, "তাদেরকে কখনো রাজপথে দেখেছেন? তারা রাজপথে ছিল না। এই তারা এবং ওরা, ওই যে যারা পালিয়ে গেছে—স্বৈরাচার এবং গুপ্ত, তারা আবার একজোট হয়েছে। বরাবরই তো তারা একসঙ্গে ছিল। ১৯৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিল, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনেও একসঙ্গে ছিল। এমনকি গত নির্বাচনের সময়ও তারা তলে তলে কাজ করেছিল। মূলত এ কারণেই তাদেরকে ‘গুপ্ত’ বলা হয়।"

এই বক্তব্যের মাত্র দুদিন পর ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের সামনে আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি কড়া ভাষায় বলেন, "বিশাল বিশাল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। বিএনপি আসার কথা থাকলেও আসে নাই, অথচ জামায়াত-শিবির লড়াই করে জীবন দিয়েছে। আপনি সেই রক্ত দেওয়া জামায়াত-শিবিরকে আজ গুপ্ত বলছেন। আপনার অন্তত লজ্জা পাওয়া উচিত।"

শীর্ষ নেতাদের এই বাকযুদ্ধের পর গুপ্ত রাজনীতির প্রসঙ্গটি কেবল আর দুটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত ১৫ অক্টোবর সরকারের আরেক শরিক ও গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নুরও এই বিতর্কে ঘি ঢালেন। তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াত বিভিন্ন প্রক্সি সংগঠন তৈরি করে রাজনীতির মাঠ ঘোলাটে করছে। তিনি বলেন, "এই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দোকান খোলা হয়েছে, নতুন সাইনবোর্ড ঝুলছে এগুলোর আশি শতাংশই আসলে জামায়াত-শিবিরের প্রক্সি।"

বাংলাদেশে গুপ্ত রাজনীতির এই চর্চা নিয়ে সবচেয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয় মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একের পর এক প্রকাশ্যে আসতে থাকেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতারা। আর ঠিক তখনই অভিযোগ ওঠে যে, এসব নেতার অনেকেই গত দেড় দশক ধরে গোপনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ছাত্রলীগের ছত্রচ্ছায়ায় হলে থাকতেন।

এই অভিযোগগুলো সবচেয়ে বেশি সামনে এনেছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, "তাদেরকে (শিবির) তো চেনাই যাচ্ছে না। তাদের পলিটিক্স আসলে কারা করছে, কী করছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। তারা প্রকাশ্যে কোনো কমিটিও দেয় না। তারা গোপনে কাউকে ডিবেটিং সোসাইটিতে পাঠায়, কাউকে সাংবাদিক সমিতিতে ঢোকায়। এভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে তারা গুপ্তভাবে আধিপত্য তৈরি করে। যেহেতু ওইসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পদধারী কেউ নেতৃত্বে আসতে পারে না, তাই ছাত্রদলের নেতারা সেখানে যেতে না পারলেও শিবির ঠিকই পারে। এই গুপ্ত অবস্থান থেকে তারা ক্যাম্পাসে যেকোনো সময় বড় ধরনের মব বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফেলতে পারে।"

আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে আসতে পারেনি, শিবিরও ছিল একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু ছাত্রদলের দাবি, তাদের প্রকাশ্য কমিটি থাকলেও শিবির এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি প্রকাশ্যে আনছে না।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, "ছাত্রদল গত তিন-চার বছরে সারাদেশে মাত্র ত্রিশ-চল্লিশটা কমিটি দিতে পেরেছে, যা নিয়ে তারা গর্ব করে। অথচ আমরা প্রতি বছর জানুয়ারিতে ১৩২টি শাখায় নিয়মিত কমিটি করি। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটিও ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে। এরপরও তারা আমাদের গুপ্ত বলবে!"

হল কমিটি না দেওয়ার বিষয়ে ফরহাদ বলেন, "সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলে দলীয় রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। শিক্ষার্থীরা যদি প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির পক্ষে মত দেয়, তবেই আমরা হলে কমিটি দেব। আর ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার যে ভুয়া ছবি ছড়ানো হয়েছে, সেগুলো কোনো দলীয় প্রোগ্রামের নয়, বরং ডিবেটিং ক্লাবের অনুষ্ঠানের।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, গুপ্ত রাজনীতি বাংলাদেশে নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এর ধরন বদলেছে। তিনি বলেন, "আগে গুপ্ত রাজনীতি বলতে বোঝাত নিষিদ্ধ বাম বা কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর আন্ডারগ্রাউন্ড কার্যক্রম। কিন্তু গত বিশ বছরে এই সংজ্ঞায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এখন কোনো দল নিষিদ্ধ না হয়েও তারা অত্যন্ত সুকৌশলে হিডেন পলিটিক্স করছে। কখনো তারা অন্য দলের সঙ্গে মিশে যায়, আবার কখনো অন্য দলে অনুপ্রবেশ করে তথ্য চুরি করে।"

জোবাইদা নাসরীনের মতে, দলগুলোর মধ্যে এই অপ্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে যে সন্দেহ, তা এখন প্রতিটি দলের ভেতরেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। "বিএনপি মনে করে তাদের ভেতরে গুপ্ত কেউ আছে, কখনো সেটা আওয়ামী লীগের, কখনো জামায়াতের। আবার আওয়ামী লীগ মনে করে তাদের সুবিধাভোগীদের অনেকেই এখন বিএনপির গুপ্ত। এই লেবেল বা ট্যাগ এখন নিজ দলের নেতাদের ঘায়েল করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। একে অপরের প্রতি এমন অবিশ্বাস দেশের রাজনৈতিক সুস্থতার জন্য বড় হুমকি।"

রাজনৈতিক দলগুলো সবসময় তাদের কৌশল প্রকাশ্যে আনে না। কিন্তু যখন কৌশল হিসেবে অন্য দলে অনুপ্রবেশের অভিযোগ সামনে আসছে, তখনই তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের সংকট। বিএনপি এই ইস্যুকে জোরালোভাবে সামনে আনছে মূলত ‘সংস্কার’ ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে কেন্দ্র করে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক বলেন, "তারা (জামায়াত) সারাদিন সংস্কার নিয়ে কথা বলে। আমরাও সংস্কার চাই। কিন্তু তারা গুপ্তভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে যে বিএনপি নাকি সংস্কার চায় না। তারা গুপ্তভাবে লংমার্চ করছে, মুভমেন্ট করছে। আমরা যদি অন্যায় করি, জনগণ আমাদের বিচার করবে। কিন্তু কোনো গুপ্ত ষড়যন্ত্র করে আপনারা সফল হবেন না।"

অন্যদিকে, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এসব অভিযোগকে স্রেফ রাজনৈতিক ট্যাগ আখ্যা দিয়ে বলেন, "এখন বিএনপিতে এমন কিছু মন্ত্রী আছেন, যাদের আমার ৪০ বছরের রাজনীতিতে কখনো মাঠে দেখিনি। তাহলে কি তাদেরও আমরা গুপ্ত মানব? এসব ভিত্তিহীন ট্যাগ দেওয়া খুব সহজ। আসলে সরকারের মূল দাবি হলো, জনগণের ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ এবং এর আলোকে যে গণভোট হয়েছে, তার রায় বাস্তবায়ন করা। সেই মূল দাবি থেকে মানুষের মনোযোগ ভিন্ন খাতে সরাতেই সরকার এবং সরকারি দল বিএনপি এখন এসব গুপ্ত রাজনীতির ধুয়া তুলছে।"

সামগ্রিকভাবে, ‍‍`গুপ্ত‍‍` রাজনীতির এই বিতর্ক দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী দূরত্ব ও অবিশ্বাস তৈরি করছে। কে প্রকৃত দেশপ্রেমিক আর কে গুপ্তচর বা অনুপ্রবেশকারী এই প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনীতি এক নতুন ও জটিল সমীকরণের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!