সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল কাঙ্ক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন এই বেতন কাঠামোতে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন (২০তম গ্রেড) ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন (১ম গ্রেড) ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় পিআইডি সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি নতুন বেতন স্কেলের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নতুন বেতন স্কেলে বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে গ্রেড-১ থেকে ১১ পর্যন্ত বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন বা ২০তম গ্রেডে বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন কাঠামোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাত বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ থেকে কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘যৌথবাহিনী নির্দেশনাবলি-২০২৬’ অনুমোদন করা হয়েছে।
বেতন স্কেলের বিপুল আর্থিক প্রভাব ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনা করে সরকার একযোগে পুরো স্কেল বাস্তবায়ন না করে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এর কার্যকারিতা ধরা হয়েছে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন স্কেল আগে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে ১ জুলাই থেকে মূল বেতনের ৩০ শতাংশ, দ্বিতীয় ধাপে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে আরও ৩৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট অংশ পরবর্তী অর্থবছরের জুলাইয়ে কার্যকর হবে। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে সব ভাতা একযোগে কার্যকর করা হতে পারে।

নতুন বেতন স্কেলে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ (ওআরওপি) ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন এবং তথ্য ঘাটতির কারণে তা ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে বর্তমান অবসরভোগীদের নিট পেনশন স্ল্যাবভিত্তিক উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া প্রথমবারের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ‘প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা’ চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আওতায় মাসে ৩ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। অন্যদিকে, সব গ্রেডের কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতা চালু করা হয়েছে, যা আগে শুধু পঞ্চম গ্রেড পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা বাজেটের একটি বড় অংশ। তবে মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্কের (এমটিবিএফ) আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করেছিল। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানকে চেয়ারম্যান করে গঠিত ওই কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে গঠিত ১০ সদস্যের কমিটি এই বেতন কাঠামোর খসড়া চূড়ান্ত করে।
এদিকে, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে, যা জাতীয় বেতন স্কেলের মতোই ধাপে ধাপে কার্যকর হবে। অর্থ বিভাগ শিগগিরই এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও বিস্তারিত নির্দেশনা জারি করবে।


আপনার মতামত লিখুন :