পাঁচ মাসের ব্যবধানে আবারও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধি করায় জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রবিবার (২১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গত এপ্রিলেও সরকার জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল।
নতুন করে এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজার সবখানেই চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক এবং ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘পকেট কাটার শামিল’ আখ্যা দিয়ে দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। সরকারিভাবে বাস ভাড়া বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসার আগেই ঢাকা শহর এবং দূরপাল্লার রুটগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়ে গেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, রাজধানীর অভ্যন্তরীণ রুটে ৫ থেকে ২০ টাকা এবং দূরপাল্লার বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। পরিবহন কর্মীরা বলছেন, বাড়তি দামে তেল কিনে পুরনো ভাড়ায় বাস চালালে তাদের লোকসান গুনতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এরই মধ্যে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং শহরের ভেতরে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবহন মালিকেরা।
তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা জানান, শুধু তেলের দাম বাড়ার কারণেই ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে একটি বাসের ট্রিপপ্রতি খরচ প্রায় চার হাজার টাকা বেড়ে গেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে পণ্য পরিবহনে। সবজি আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পঞ্চগড়, খুলনা, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পণ্য আনার ট্রাক ভাড়া এক রাতেই ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
রায়েরবাজারের এক সবজি ব্যবসায়ী জানান, পরিবহন খরচের এই বাড়তি বোঝা শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদেরই বহন করতে হবে, ফলে বাজারে প্রতিটি পণ্যের দাম কেজিপ্রতি অন্তত ১০ টাকা বেড়ে যাবে।
একই চিত্র স্থলবন্দরগুলোতেও। বেনাপোল স্থলবন্দরে ট্রাক ভাড়া ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এছাড়া কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জও প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে বাধ্য হয়েই এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, দাম না বাড়ালে সরকারের টিকা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ব্যাহত হতো।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী থাকার সময় এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) একে ‘গণবিরোধী’ সিদ্ধান্ত আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে বর্ধিত দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যেই সরকার জনগণের ওপর এমন বেপরোয়া চাপ সৃষ্টি করছে, যা বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :