দেশে ধাপে ধাপে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০০৯ সালে দেশে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা। দেড় দশকের ব্যবধানে তা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ২০২৫ সালের জুন শেষে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তবে বিপুল অঙ্কের এই খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও ‘ছাড়’ দেওয়ার নীতিতেই হাঁটছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংকিং খাত বাঁচাতে কঠোর হওয়ার দৃষ্টান্ত স্থাপন না করলে আগামী বছর এই অঙ্ক আট লাখ কোটিতে পৌঁছাতে সময় লাগবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবে অপরিণামদর্শী ঋণ বিতরণ, তদারকির অভাব এবং ব্যাংক পরিচালকদের নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণের বোঝা আজ পাহাড়সম।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও ব্যবসায়িক নিষেধাজ্ঞা বা সম্পদ নিলামের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার রীতি থাকলেও বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। অর্থঋণ আদালতে মামলা দীর্ঘস্থায়ী হওয়া এবং বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো বন্ধ হলে বিপুল বেকারত্ব তৈরির যুক্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত ছাড়ের পথেই হাঁটছে।
গত ৩১ আগস্ট জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এক হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ পুনঃতফসিল বা নবায়নের পর তা পরিশোধের জন্য ১৫ বছর সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথম দুই বছর তাদের কোনো কিস্তি দিতে হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি হলো মামলা করে ১০ বছরে যে টাকা আদায় হবে না, তার চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে এখন অন্তত ৫০ শতাংশ আদায় হলে ব্যাংকের তারল্য বাড়বে। একই সঙ্গে কারখানা চালু থাকলে কর্মসংস্থানও রক্ষা পাবে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সমালোচনা রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসব সুযোগ নিয়ে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা আরও খেলাপির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর বড় দায়িত্ব রয়েছে এবং ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব জানান, বিদ্যমান আইনে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিচালকদের জবাবদিহি, দ্রুত বিচার এবং খেলাপিদের বিদেশ ভ্রমণ ও নতুন ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞাসহ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :