ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

এই দহন আজও নিভে না: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর এবং কাঠামোগত ব্যর্থতার খতিয়ান

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬, ০১:৩১ পিএম

এই দহন আজও নিভে না: মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর এবং কাঠামোগত ব্যর্থতার খতিয়ান

ক্যালেন্ডারের পাতায় হয়তো একটি বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু অনেক পরিবারের কাছে সময় যেন ২০২৫ সালের ২১ জুলাইয়ের সেই দুপুরেই থমকে আছে। দুপুর সোয়া ১টা। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে তখন সবেমাত্র স্কুল ছুটি হয়েছে কারো কারো। কেউ ক্লাসে বসে আছে, কেউ টিফিন খাচ্ছে, কেউ বা বন্ধুদের সাথে খুনসুটি করছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে তখন এক সাধারণ, নিরুপদ্রব দুপুর। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ থেকে নেমে এলো মৃত্যু।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি এফটি-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিকট শব্দে আছড়ে পড়ল স্কুল ভবনের ওপর। নিমেষেই চারদিক ঢেকে গেল কালো ধোঁয়া আর আর্তনাদে। ওই এক লহমায় অঙ্গার হয়ে গেল ২৮টি নিষ্পাপ শিশু। পাইলট, শিক্ষক, কর্মচারী মিলিয়ে প্রাণ হারালেন মোট ৩৬ জন।

একটি দেশের জন্য এর চেয়ে নির্মম দৃশ্য আর কী হতে পারে? শিশুরা স্কুলে গিয়েছিল বইয়ের ব্যাগে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে, কিন্তু ফিরেছিল কেউ লাশ হয়ে, কেউ দগ্ধ শরীর নিয়ে, আর কেউ বা আজও বয়ে বেড়াচ্ছে এক ভয়াবহ মানসিক ক্ষত। এক বছর পেরিয়ে গেলেও এই দুর্ঘটনার আগুন শুধু একটি ভবনকে পোড়ায়নি; এটি পুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের নিরাপত্তাবোধ, নগর-পরিকল্পনার বিবেক এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের বিশ্বাসযোগ্যতা।


দুর্ঘটনার এক বছর পর এসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো, ক্ষতি শুধু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নেই। নিহত প্রতিটি শিশুর সঙ্গে একটি পরিবার হারিয়েছে তাদের ভবিষ্যৎ, একটি সমাজ হারিয়েছে নির্ভেজাল একখণ্ড শৈশব। নিহত সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সামিউল করিম সমীরের বাবা রেজাউল করিম ঘটনার দিন ছেলেকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন; তার চোখের সামনেই বিমানের একটি ডানা তার সন্তানকে আঘাত করে। ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেও আগুন আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে তাকে বাঁচাতে পারেননি তিনি।

এক বছর পরও সমীরের মা মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় প্রতিদিন বিকেলে খাবার টেবিলে ছেলের জন্য ভাত বেড়ে অপেক্ষা করেন। একইভাবে প্রাণ হারায় দুই ভাইবোন ষষ্ঠ শ্রেণির তানিয়া আশরাফ নাজিয়া এবং দ্বিতীয় শ্রেণির আরিয়ান আশরাফ নাফি; শতভাগ দগ্ধ নাফি নিজের নাম ধরে চিৎকার করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাদের পিতা জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর তারা স্বামী-স্ত্রী কেবল ‍‍`জীবন্ত লাশে‍‍` পরিণত হয়েছেন।

বান্দরবান থেকে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসা উক্য ছাইং মারমার বাবা-মা শেষ মুহূর্তে ছেলের সাথে একটি কথাও বলতে পারেননি। এই প্রতিটি ঘটনা প্রমাণ করে যে, একটি শিশু যখন অকালে ঝরে যায়, তখন একটি গোটা পরিবারের বেঁচে থাকার অর্থ চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

যারা বেঁচে ফিরেছে, তাদের অনেকেরই শারীরিক ক্ষত হয়তো শুকাচ্ছে, কিন্তু মানসিক ট্রমা আজও দগদগে। যে শিশুরা একসময় বিমানের শব্দ শুনে কৌতূহল নিয়ে বারান্দায় ছুটে যেত, আজ তারা বিমানের ইঞ্জিনের শব্দ শুনলেই আতঙ্কে জমে যায় কিংবা আত্মরক্ষার জন্য নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে।

বেঁচে যাওয়া শিক্ষার্থী মুকতাদির কিংবা ফাহিম আজও আকাশে বিমানের শব্দ শুনলে আঁতকে ওঠে, তাদের মনে হয় যেন আরেকটি বিমান খসে পড়ছে। মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়া অনেক শিক্ষার্থী, যেমন সামিয়া আক্তার, আজও রোদে বের হতে পারে না, নিয়মিত ক্লাসে যেতে পারে না, কেবল পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের ক্যাম্পাসে আনা হয়। এই দহন বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু এটি প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে সমাজকে খেয়ে ফেলে। একটি দুর্ঘটনার পরে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত হয় যখন ট্রমা, অনিশ্চয়তা আর বিচারহীনতা একসঙ্গে বাসা বাঁধে।

দুর্ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব কারণ উঠে এসেছে, সেগুলো শুধু একটি দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক গাফিলতির এক চূড়ান্ত সাক্ষ্য। তদন্ত বলছে, নিহত পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণে ধারাবাহিকতার ঘাটতি ছিল এবং একক উড্ডয়নের সময় গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিং-এর যথাযথ তদারকির চরম অভাব ছিল।

কিন্তু প্রাণহানির মাত্রা এতটা ভয়াবহ হওয়ার মূল কারণ কেবল বিমানের ত্রুটি ছিল না; এর পেছনে ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নির্লিপ্ততা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নিয়ম তোয়াক্কা না করে গড়ে তোলা হয়েছিল ওই ক্যাম্পাসের অর্ধেকের বেশি ভবন। যে হায়দার আলী ভবনে বিমানটি আছড়ে পড়ে, সেখানে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী ও ৫০ জনের বেশি শিক্ষকের জন্য মাত্র একটি চার ফুট চওড়া সিঁড়ি ছিল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় সেই একমাত্র সিঁড়ির ঠিক সামনেই। ফলে বিমানে থাকা ২১৫০ লিটার জেট ফুয়েল যখন আগুনের রূপ নেয়, তখন আবদ্ধ ভবনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়েই সেদিন বেশি মৃত্যু ঘটেছিল। অর্থাৎ, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল অব্যবস্থাপনার এক চূড়ান্ত মৃত্যুফাঁদ।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি আমাদের আরেকটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে জনবহুল এলাকার পাশে উচ্চঝুঁকির সামরিক প্রশিক্ষণ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং নিরাপত্তার ন্যূনতম মানদণ্ড না মানার সংস্কৃতি।

তদন্ত প্রতিবেদনে ৩০টিরও বেশি সুপারিশ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল ঢাকা শহরের বাইরে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন স্থানান্তর, বিমানবন্দরের আশপাশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ, এবং ফ্লাইট পাতের নিচ থেকে স্কুল-হাসপাতাল-ক্লিনিক জাতীয় স্থাপনা পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মেট্রোরেল ডিপোর ৩০০ ফুট নিরাপত্তা বাফারের মধ্যে নির্মিত অবৈধ স্থাপনাগুলো সরাতে রাজউক চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে উচ্ছেদ অভিযানগুলো স্থবির হয়ে আছে।

এক বছরেও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন ৬৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এবং রাজউকের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে বিমানবন্দর এলাকার ফানেল জোনের নিরাপত্তা আজও হুমকির মুখে। এমনকি, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার পরও মাইলস্টোন স্কুল কর্তৃপক্ষ একই ক্যাম্পাসে নতুন আরেকটি সাততলা ভবন নির্মাণের জন্য রাজউকের কাছে আবেদন করেছে, যা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির চরম শূন্যতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় 1 ।

সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গাটি হলো, ৩৬৫ দিন পেরিয়ে গেলেও স্বজনহারা পরিবারগুলোর সাথে ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার নিয়ে চলছে এক নির্মম প্রহসন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর দায়ের করা রিটে হাইকোর্ট নিহতদের পরিবারের জন্য ৫ কোটি টাকা এবং আহতদের জন্য ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের রুল জারি করলেও, একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি নিহতদের জন্য মাত্র ২০ লাখ এবং আহতদের জন্য ৫ লাখ টাকা অনুদান নির্ধারণ করে।

ক্ষতিগ্রস্ত একটি পরিবারও সরকারের এই অপমানজনক অর্থ গ্রহণ করেনি। যেসব শিশুর শরীরের একটি বড় অংশ পুড়ে গেছে, তাদের মাসের পর মাস ধরে চলা লেজার ট্রিটমেন্ট এবং প্লাস্টিক সার্জারির খরচের তুলনায় এই অর্থ নিতান্তই অপ্রতুল।

নিহত শিশু তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার আক্ষেপ করে জানিয়েছেন, "পুরো পৃথিবী এনে দিলেও কি আমার আয়মান ফিরে আসবে? এই অবহেলার পর কেবল কিছু টাকা দিয়ে রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না"।

নিহত শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান বলেন, তার ছেলের পড়ার টেবিলটা এক বছর ধরে একইভাবে পড়ে আছে; তাদের প্রাণবন্ত বাসাটি এখন কবরস্থানের মতো। এই প্রত্যাখ্যান শুধু অর্থের অঙ্কের জন্য নয়; এটি রাষ্ট্রের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে পরিবারগুলোর নীরব কিন্তু সুদৃঢ় প্রতিবাদ। অধিকন্তু, দুর্ঘটনার পর জমা দেওয়া তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আজও জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি, যা আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

আজকের দিনটি তাই কেবল একটি বার্ষিকী নয়; এটি স্মরণ, শোক এবং জবাবদিহিরও দিন। আমরা কি শোককে কেবল স্মৃতিতে পরিণত করব, নাকি শোককে নীতিতে রূপান্তরিত করব? প্রতি বছর মোমবাতি প্রজ্বলন, নীরবতা পালন বা নিহতদের স্মরণে ‍‍`সবুজের মাঝে অমর তোমরা‍‍` স্লোগানে গাছের চারা রোপণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত এবং নীতিগত স্তরে কঠোর ও নির্মম সংস্কার। জনবহুল এলাকার ওপর দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করা, অনুমোদনহীন ভবনে বাণিজ্য করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো উচ্ছেদ করা এখন আর বিকল্প নয়, অপরিহার্য কর্তব্য।


একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই কেবল একটি ‘ঘটনা’ হয়ে থাকা উচিত নয়। তা হওয়া উচিত এক অনিবার্য নৈতিক ধাক্কা, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে বদলাতে বাধ্য করে। মাইলস্টোনের আকাশে আজও যে ২৮টি নিষ্পাপ শিশুর দীর্ঘশ্বাস ভেসে বেড়াচ্ছে, তা আমাদের বিবেকের কাছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। যতদিন না প্রতিটি শিশু নিশ্চিন্তে স্কুলে যেতে পারে, যতদিন না রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারে যে একটি প্রশিক্ষণ উড্ডয়ন আর কোনো শ্রেণিকক্ষকে মৃত্যুকূপে পরিণত করবে না ততদিন ২১ জুলাই কেবল একটি তারিখ নয়, আমাদের জাতীয় বিবেকের এক অপূরণীয় ক্ষতের নাম হয়ে থাকবে। শোককে শক্তিতে পরিণত করে টেকসই নগর-নীতি ও নিরাপত্তার রক্ষাকবচ নিশ্চিত করাই হবে নিহত শিশুদের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন। এই দহন আজীবনের এবং যদি আমরা সত্যিই শিক্ষা না নিই, তবে দায়ও আজীবনের হয়ে থাকবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

 

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!