ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

ধর্মরাজনীতি ও সমাজের ভাঙা সেতুবন্ধন

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ২৭, ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম

ধর্মরাজনীতি ও সমাজের ভাঙা সেতুবন্ধন

বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় আজও রাজনৈতিক জীবনের একটি শক্তিশালী ও সংবেদনশীল অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যখন কোনো নেতার বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড ধর্মভিত্তিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে সমাজের নরম কোষে বড় ধরনের ভাঙন ধরায়, রাজনৈতিক মঞ্চে ভিন্নমতের তীব্র সংঘাত জন্মায় এবং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এক অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি মূলত দেশের অর্থনীতি ও সামগ্রিক নীতিনিয়ন্ত্রণকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে থাকে। ধর্মীয় বিবেচনাই যদি দলীয় চিন্তা-চেতনার প্রধান ফিল্টার বা মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে নাগরিকত্ব, শিক্ষানীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ জাতীয় নীতিগুলোর পরিণতি হয়ে দাঁড়ায় পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত। এমন একপেশে পরিবেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধিকার, দীর্ঘদিনের সামাজিক ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নীতিনির্ধারকেরা যখন জনকল্যাণের চেয়ে ধর্মভিত্তিক ইস্যুগুলোকে নিজেদের ব্যক্তিগত বা দলীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বানিয়ে ফেলেন, তখন দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও স্বাভাবিক ন্যায়িক প্রক্রিয়া অনায়াসে এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ ও চক্রান্তের শিকার হতে বাধ্য হয়।

এর পাশাপাশি, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক তর্কসাম্য সামাজিক সম্পর্কের ভেতরের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একই পাড়া-মহল্লায় যুগ যুগ ধরে শান্তিতে বসবাসকারী ভিন্ন ধর্মের সাধারণ মানুষদের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়; যার ফলে দীর্ঘদিনের সামাজিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক ভ্রাতৃত্ববোধ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হয়। মূলধারার মিডিয়া ও বর্তমানের সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে যখন এমন সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে অতিরিক্ত আলোড়ন সৃষ্টি করা হয়, তখন তা দ্রুত গোষ্ঠীতান্ত্রিক নেতিবাচক প্রচারণা ও নানামুখী গুজবের ডালপালা মেলে, যা প্রায়শই সমাজে ধর্মীয় সহিংসতা ও নিপীড়নের বিষাক্ত বীজ বপন করে। তখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সংলাপের সুস্থ বিকল্প হিসেবে ক্রমশ ‘মোব মেন্টালিটি’ বা উত্তেজিত জনতার উগ্র মনোভাব কাজ করতে শুরু করে-যা একটি বহুত্ববাদী সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা ও স্থিতিশীলতাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি আমাদের সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একদলীয়তা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের পথও খুলে দেয়। রাজনৈতিক নেতারা যখন জনকল্যাণের বাস্তব কাজ বাদ দিয়ে কেবল ধর্মীয় উত্তেজনা জাগিয়ে সাধারণ মানুষের ভোট ও অন্ধ সমর্থন সংগ্রহের সস্তা কৌশল নেন, তখন রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ভাষার শব্দচয়ন, প্রতিশ্রুতি এবং প্রকাশ্য নৈতিকতার মান ক্রমশ নিচে নামতে থাকে। এমন বিষাক্ত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র কেবল নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে না, বরং অনেক সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক আদর্শের অনুকরণে একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও একপেশে ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। এর ফলে রাষ্ট্রের বিচারিক দূরদর্শিতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি সাধারণ মানুষের যে মৌলিক বিশ্বাস, তা ধীরে ধীরে ক্ষয় পেতে থাকে।

এই সব গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে এখনই কিছু কাঠামোগত, নীতিগত ও সামাজিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত অপরিহার্য। যেকোনো সমাজেই ধর্মভিত্তিক উত্তেজনা বা ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে যদি সুনির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীকে বিভাজন বা হেনস্থা করার অপচেষ্টা চালানো হয়, তবে রাষ্ট্রকে কোনো ধরনের পক্ষপাত না করে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি দেশের স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা ও সিভিল সোসাইটির ভূমিকা সবসময় সক্রিয় রাখা প্রয়োজন।

স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবকদের নিয়ে একযোগে কাজ করতে হবে এবং তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত মিথস্ক্রিয়া ও পারস্পরিক সংলাপের স্থায়ী প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে হবে, যেখানে যেকোনো ধরনের ভুল বোঝাবুঝি বা সামাজিক গুজব তৈরি হওয়া মাত্রই তা স্থানীয়ভাবে দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়।

একই সাথে মূলধারার সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে ধর্মভিত্তিক কোনো সংবেদনশীল বার্তা বা খবর ছড়ানোর আগে তার সত্যতা ও সামাজিক প্রভাব কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। গুজব ও উসকানিমূলক বক্তব্য রোধে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং কঠোর আইনি মেকানিজম থাকা জরুরি। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের নাগরিক শিক্ষার ওপর জোর বাড়াতে হবে; যেখানে সব নাগরিকের সমঅধিকারের ধারণা, বহুত্ববাদের প্রকৃত মূল্য এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বাস্তব শিক্ষা দেওয়া হবে, যা সমাজকে ভেতর থেকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখবে।

ধর্মভিত্তিক ইস্যুগুলো রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হলেও সেটিকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে মানবতাবোধের বাইরে দাঁড় করানো রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য কখনো শুভ ফল বয়ে আনে না। কোনো একক ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিবাদ, অপরাধ বা কোনো নির্দিষ্ট নেতার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে যদি সামগ্রিকভাবে একটি পুরো ধর্মীয় গোষ্ঠীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করা হয়, তবে তা বাংলাদেশের শত বছরের ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দীর্ঘদিনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মূল ভিত্তিকেই চিরতরে উপড়ে ফেলবে। তাই রাজনৈতিক খেলা বা ক্ষমতার লড়াইকে সবসময় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনি সীমার মধ্যে রাখা না গেলে, তার চূড়ান্ত ক্ষতি এককভাবে কোনো নেতার হবে না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমাজের সবচেয়ে নমনীয়, সাধারণ এবং নিরাপত্তাহীন মানুষগুলোই যা শেষ পর্যন্ত আমাদের কারোরই কাম্য নয়। 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!