ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

করিডরের নামে কীসের দরজা খুলছে বাংলাদেশ?

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ৩০, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

করিডরের নামে কীসের দরজা খুলছে বাংলাদেশ?

বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত সময়ের মুখোমুখি। কাগজে-কলমে একে বলা হচ্ছে করিডরের প্রস্তাব, উন্নয়নের সম্ভাবনা, আঞ্চলিক সংযোগের নতুন দরজা। কিন্তু দেশের মানুষ জানে, বড় বড় শব্দের আড়ালে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে ছোট না, বরং বিশাল হিসাব যার মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। চীন যে করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিছক একটি সড়ক, বন্দর-সংযোগ বা বাণিজ্যপথ নয়; এটি আসলে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের ওপর এক নতুন পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে আমাদের আবেগ নয়, দরকার দৃঢ়তা; মোহ নয়, দরকার জবাবদিহি; আর বিদেশি বন্ধুত্বের মিষ্টি ভাষা নয়, দরকার জাতীয় স্বার্থের কঠিন হিসাব।

আমরা এমন এক দেশে বাস করি, যেখানে বড় প্রকল্পের নাম শুনলেই অনেকে উল্লসিত হয়ে ওঠেন। উন্নয়ন, বিনিয়োগ, সংযোগ, রপ্তানি এই শব্দগুলো শুনতে মধুর, কিন্তু প্রতিটি মধুর শব্দেরও একটা মূল্য থাকে। সেই মূল্য যদি হয় সার্বভৌম নীতির ক্ষয়, সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার সংকোচ, বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অদৃশ্য ঋণের বোঝা, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে উন্নয়ন নয়; সেটি হয় নির্ভরতার নতুন কাঠামো। চীনের প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে আলোচনায় তাই প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত বাংলাদেশ কী পাবে? আর দ্বিতীয় প্রশ্ন আরও কঠিন এই পাওয়ার বিনিময়ে কী হারাতে পারে বাংলাদেশ?

সরকার বলছে, বিষয়টি পর্যালোচনায় আছে। ভালো কথা। কিন্তু শুধু “পর্যালোচনা” শব্দটি উচ্চারণ করলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। পর্যালোচনার মানে হলো খোলা চোখে দেখা, খোলা মনে শোনা, আর খোলা কানে জনতার উদ্বেগ গ্রহণ করা। দেশের মানুষ এখন আর আগের মতো সরল নয়। তারা জানে, চুক্তির ভাষা যতই সুন্দর হোক, শর্তের ভাষা লুকোনো থাকে সূক্ষ্ম অক্ষরে। একেকটি অবকাঠামো প্রকল্পের ভেতরে কখনও ঢুকে পড়ে ঋণের ফাঁদ, কখনও ঢুকে পড়ে রাজনৈতিক প্রভাব, কখনও ঢুকে পড়ে নিরাপত্তার নতুন জট। তাই প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এই করিডরকে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি করিডর একদিন বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে?

চীনের মতো একটি পরাশক্তি যখন কোনো অঞ্চলে করিডরের কথা বলে, তখন তা নিছক মানবিক ভ্রাতৃত্বের ভাষা নয়। সেটি অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ভাষা, বাণিজ্যিক পুনর্বিন্যাসের ভাষা, এবং অনেক সময় কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর ভাষা। এশিয়ার বহু দেশে এই একই ভাষা নানা রূপে উচ্চারিত হয়েছে। কোথাও তা বন্দর উন্নয়নের নামে এসেছে, কোথাও ঋণের বোঝা হয়ে বসেছে, কোথাও আবার পররাষ্ট্রনীতিকে ধীরে ধীরে অন্যের ইচ্ছার কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশকে এই অভিজ্ঞতাগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ইতিহাসে যারা শুধু লাভের হিসাব দেখে, তারা শেষে ক্ষতির দাম চুকায়।

এই জায়গায় বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার ও নির্দয়ভাবে যুক্তিনির্ভর। করিডর যদি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, যদি বন্দরের সক্ষমতা বাড়ায়, যদি রপ্তানি সহজ করে, যদি সীমান্ত বাণিজ্যে নতুন গতি আনে তাহলে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু সেই আলোচনায় প্রথম শর্ত হবে স্বচ্ছতা। দ্বিতীয় শর্ত হবে নিরাপত্তা। তৃতীয় শর্ত হবে, বাংলাদেশের ভূখণ্ড, বন্দর, নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে এই করিডরকে উন্নয়ন বলা যাবে না; এটি হবে অন্যের কৌশলের জন্য আমাদের মাটি ব্যবহার করার নতুন ব্যবস্থা।

এখানেই সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সতর্কতা। বাংলাদেশকে যেন কেউ এমন অবস্থায় না ঠেলে দেয়, যেখানে আমরা একদিকে উন্নয়নের প্রশংসা শুনব, অন্যদিকে সার্বভৌম সিদ্ধান্তের জায়গা ক্রমে সংকুচিত হয়ে যাবে। বড় শক্তিগুলো কখনও সরাসরি শাসন করতে চায় না; তারা অনেক সময় অবকাঠামো, ঋণ, বাজার, বিনিয়োগ আর প্রযুক্তির ভেতর দিয়ে প্রভাব তৈরি করে। এই প্রভাব চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে চাপ তৈরি করে। তাই এই করিডর প্রসঙ্গে শুধু অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বাধীনতার হিসাবও খোলাখুলি করতে হবে।

আরেকটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা দরকার বাংলাদেশের কূটনীতি কারও বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু কারও লেজুড়বৃত্তিও নয়। আমরা চাই বন্ধুত্ব, চাই সহযোগিতা, চাই পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক। কিন্তু বন্ধুত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত সমতা। যে সম্পর্ক সমতায় দাঁড়ায় না, সে সম্পর্ক একদিন অধীনতার দিকে গড়ায়। চীন হোক, ভারত হোক, যুক্তরাষ্ট্র হোক বা অন্য কোনো শক্তি বাংলাদেশকে এমন কূটনীতি চালাতে হবে, যেখানে দেশের স্বার্থ হবে কেন্দ্র, আর অন্য সব প্রস্তাব হবে তার চারপাশে দাঁড়ানো উপাদান। কেন্দ্র হারালে রাষ্ট্র হারায় নিজের দিকনির্দেশনা।

এই করিডর প্রস্তাবের ভেতরে তাই আবেগের চেয়ে বেশি প্রয়োজন বুদ্ধির, এবং বুদ্ধির চেয়েও বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক সাহসের। কারণ সহজ উত্তর দিতে পারা নেতারা অনেক সময় কঠিন সত্য এড়িয়ে যান। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা মানে সহজ উত্তর নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা মানে কঠিন সিদ্ধান্ত, কঠিন প্রশ্ন, আর কঠিন অবস্থান। আজ যদি বাংলাদেশ বিনয়ের নামে অতিরিক্ত নরম হয়, তাহলে আগামীকাল সে নিজের শর্তে কথা বলার ক্ষমতা হারাতে পারে। আর একবার যদি সেই ক্ষমতা চলে যায়, তখন করিডর থাকবে ঠিকই কিন্তু সিদ্ধান্তের রাস্তা চলে যাবে অন্য কোথাও।

বাংলাদেশের জনগণ চায় উন্নয়ন, কিন্তু ভিক্ষার উন্নয়ন নয়। জনগণ চায় সংযোগ, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয়। জনগণ চায় বাণিজ্য, কিন্তু এমন বাণিজ্য নয় যা ভবিষ্যতে দেশের কণ্ঠরোধ করবে। তাই সরকারকে এখনই দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট হতে হবে। কী শর্তে আলোচনা চলছে, কী ধরনের সুবিধা আসতে পারে, কী ঝুঁকি আছে, কোন প্রতিষ্ঠান তদারকি করবে, সংসদ কী ভূমিকা রাখবে এসব প্রশ্নের উত্তর না দিলে করিডর নিয়ে জনআস্থা তৈরি হবে না। আর জনআস্থা ছাড়া কোনো বড় প্রকল্প শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।

শেষ পর্যন্ত কথা একটাই বাংলাদেশকে কেউ করিডর উপহার দিলে সেটিকে দারুণ সুযোগ ভেবে নাচা যাবে না। আবার আতঙ্ক ছড়িয়েও লাভ নেই। প্রয়োজন নীতিগত দৃঢ়তা, কূটনৈতিক বুদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থে অনড় অবস্থান। করিডর যদি উন্নয়নের পথ হয়, তবে তা হোক বাংলাদেশের শর্তে। আর যদি তা প্রভাব বিস্তারের দরজা হয়, তবে সেই দরজা ভদ্রভাবে নয় সাহসের সঙ্গে বন্ধ করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নিজের মাটি, নিজের মানুষ, আর নিজের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। উন্নয়ন দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার মর্যাদা। আর মর্যাদা ছাড়া উন্নয়ন শুধু চকচকে এক প্রতারণা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!