ইরানের বিভিন্ন এলাকায় রাতভর দফায় দফায় রহস্যময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এই হামলার সঙ্গে নিজেদের কোনও সম্পৃক্ততা নেই বলে স্পষ্ট দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী (সেন্টকম)।
মার্কিন দায় অস্বীকারের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। ফলে, ইরানে নতুন করে হওয়া এই বিস্ফোরণগুলোর উৎস ও নেপথ্যের কারিগর নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন রহস্য ঘনীভূত হয়েছে।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় এসব বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
মেহর নিউজ এজেন্সির তথ্যমতে, পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত বুশেহর শহর এবং এর পার্শ্ববর্তী চোগাদাক এলাকায় একাধিক বিকট বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় কোনারাক শহরেও আরও তিনটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। তবে বন্দর আব্বাস শহরে বিস্ফোরণের যে খবর মেহর নিউজ প্রথমে প্রকাশ করেছিল, পরে তারা সেটি প্রত্যাহার করে নেয়।
বিস্ফোরণের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে মেহর নিউজ বিস্তারিত কিছু না জানালেও, বুশেহরের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক উপ-গভর্নর এহসান জাহানিয়ান রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আইআরএনএ-কে জানান, শহরে শোনা যাওয়া বিকট শব্দ মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হওয়ার কারণে হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, বুশেহর শহরের উপকণ্ঠে একটি সামরিক সদর দপ্তরে অজ্ঞাত একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।
ইরানে এসব বিস্ফোরণের খবরের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) আল জাজিরাকে নিশ্চিত করে যে, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানে তারা নতুন করে কোনও সামরিক অভিযান চালায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র দায় অস্বীকার করলেও ইসরায়েলের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুদ্ধের সুর চড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর টেলিফোনে দীর্ঘ কথা হয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন পদক্ষেপ সম্পর্কে ট্রাম্প তাকে বিস্তারিত অবহিত করেছেন। দুই নেতা ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হন।
দক্ষিণ ইসরায়েলের হাতজেরিম বিমানঘাঁটিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, “ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়নি, সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আকাশসীমায় নিরঙ্কুশ আধিপত্য ধরে রাখাই ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির অন্যতম ভিত্তি।” ইসরায়েলের শীর্ষ কর্তারাও সুর মিলিয়েছেন:
সেনাপ্রধান ইয়াল জামির: “ইরানের বিরুদ্ধে আমাদের সামরিক অভিযান শেষ হয়নি। নতুন পরিকল্পনা তৈরি রয়েছে এবং সামনে আরও বড় ধরনের অভিযান হতে পারে, সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।”
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ: “সেনাবাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। আকাশে আবারও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে এবং প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারও ইরানে হামলা চালিয়ে হুমকি চিরতরে দূর করতে আমরা বদ্ধপরিকর।”
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে কাতার ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর থেকেই মূলত নতুন করে এই পাল্টাপাল্টি সংঘাতের সূচনা হয়। ইরান চাইছে সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের উপকূলঘেঁষা রুট দিয়ে চলাচল করুক, যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিরোধের মূলে রয়েছে দুই পক্ষের ভিন্ন ভূরাজনৈতিক অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমাতে হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে চান। অন্যদিকে, ইরান কোনোভাবেই ওই প্রণালির ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হারাতে রাজি নয়।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার পর ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের নেতৃত্বকে ‘নোংরা লোক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং জানিয়েছেন দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যত শেষ হয়ে গেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ চুক্তি থেকে সরে না দাঁড়ালেও, অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যেই ইরানের ‘তেল রপ্তানির ওপর দেওয়া বিশেষ ছাড়’ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তবে এতকিছুর পরও ট্রাম্প প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আপাতত শান্তি আলোচনার দরজা হয়তো এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।


আপনার মতামত লিখুন :