বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। হরমুজ প্রণালিতে দুটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে ইরানের ‘দুঃসাহসিক’ হামলার অভিযোগ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), যাতে একজন ভারতীয় নাবিক নিহত ও আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এই হামলার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে এবং এই জলপথ ব্যবহারকারী সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে। পাল্টাপাল্টি এই পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থা নিরসনের সম্ভাবনা আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে।
সোমবার রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দুটি জাতীয় ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে সরাসরি আঘাত হেনেছে। আহত আটজনের মধ্যে ছয়জন ভারতীয় এবং দুজন ইউক্রেনীয় নাগরিক রয়েছেন। ইউএই এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘গুরুতর লঙ্ঘন ও স্পষ্ট অবমাননা’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) টেলিগ্রামে এক বিবৃতিতে এই হামলার দায় স্বীকার করে বলেছে, ট্যাংকার দুটি বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে নেভিগেশন ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল এবং মাইন পাতা একটি রুট দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আইআরজিসি সতর্ক করে বলেছে, ‘আগ্রাসী শত্রুকে’ সহযোগিতা করলে শেষ পর্যন্ত বিশ্বে চরম জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হবে।
টানা তৃতীয় রাতের মতো ইরানে মার্কিন হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক ঘোষণায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করছে।
ট্রাম্প নিজেকে ‘হরমুজ প্রণালির অভিভাবক (দ্য গার্ডিয়ান অব দ্য হরমুজ স্ট্রেইট)’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিশ্বের এই অত্যন্ত অস্থিতিশীল অংশে নিরাপত্তা প্রদানের খরচ মেটাতে প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত সব পণ্যের ওপর মঙ্গলবার গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টা থেকে ২০ শতাংশ হারে চার্জ বা শুল্ক আদায় করা হবে। এর ফলে ইরানের কোনো জাহাজ এই পথে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারবে না, তবে অন্যান্য দেশ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে প্রণালিটি ব্যবহার করতে পারবে।
হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “আমরা তাদের সব আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ধ্বংস করছি এবং প্রণালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছি। তবে হ্যাঁ, আমি মনে করি একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনও সম্ভব।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে সোমবার সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের বুশেহর, চাহ বাহার, জাস্ক, কোনারাক, আবু মুসা এবং বান্দার আব্বাসসহ বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকম জানিয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর সক্ষমতা ধ্বংস করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন এই হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
ট্রাম্পের এই একতরফা শুল্ক আরোপের ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছে খোদ জাতিসংঘ। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (আইএমও) রয়টার্সকে জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত কোনো প্রণালি অতিক্রম করার জন্য বাধ্যতামূলক টোল আরোপের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং তারা এর চরম বিরোধী।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার পরিহাস করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, “পোটাস (মার্কিন প্রেসিডেন্ট) সম্পূর্ণ সঠিক, নিরাপত্তা দিলে পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত। তবে ইরান সবসময়ই এই প্রণালির ‘গার্ডিয়ান’ ছিল এবং চিরকাল তাই থাকবে। ২০ শতাংশ অনেক বেশি, আমরা ন্যায্য থাকব।”
হরমুজ প্রণালি ওমানের এবং ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় ট্রাম্পের সর্বশেষ এই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর ইরান প্রণালিটি কার্যত বন্ধ করে দিলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়।
জুনে এক সমঝোতার মাধ্যমে অবরোধ সাময়িক তুলে নেওয়া হলেও, নতুন করে ট্রাম্পের ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তে খোদ মার্কিন মিত্ররাই আপত্তি তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তেলের দাম নতুন করে বৃদ্ধি পেলে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীরা ভোটারদের মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শুল্ক আরোপের ঘোষণা মূলত আলোচনা পুনরায় শুরু করার এবং অন্য দেশগুলোকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার ট্রাম্পের একটি বহু-ব্যবহৃত কৌশল হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :