ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, কড়াইশুঁটি দিয়ে আলুর দম কিংবা আলু-পরোটা নাম শুনলেই জিভে জল আসে অনেকের। বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি খাওয়া খাবারের তালিকায় অন্যতম হলো আলু। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই প্রিয় আলু খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি, ব্লোটিং (পেট ফাঁপা ভাব) কিংবা তীব্র গ্যাসের সমস্যা দেখা দেয়। অনেকের আবার বেশি পরিমাণে সেদ্ধ আলু বা চিপস খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে পেট ফুলে ওঠে।
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, অতিরিক্ত আলু খেলে কি আসলেই গ্যাসের সমস্যা হয়? এই বিষয়ে ভারতের প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. অরুল প্রকাশ জানিয়েছেন, এর কোনো সরল উত্তর নেই। অর্থাৎ, এর জবাবে কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা সম্ভব নয়।
ডা. অরুল প্রকাশ ব্যাখ্যা করে বলেন, “যেসব খাবার খেলে মানুষের সবচেয়ে বেশি গ্যাসের সমস্যা হয়, সাধারণত সেই তালিকায় আলু নেই। তবে অতিরিক্ত আলু খেলে নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কারো কারো পেটে ফাঁপা ভাব অনুভূত হতে পারে এবং গ্যাসের সমস্যা তৈরি হতে পারে। এটি মূলত নির্ভর করে একেক জনের হজম ক্ষমতা ও শারীরিক গঠনের ওপর।”
বিজ্ঞান বলছে, আলু হলো স্টার্চ বা শ্বেতসার সমৃদ্ধ খাবার। এই স্টার্চের বেশিরভাগ অংশ আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম ও শোষিত হয়। তবে এর কিছু অংশ ক্ষুদ্রান্ত্রের পাচন প্রক্রিয়া এড়িয়ে অক্ষত অবস্থায় বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘রেজিস্ট্যান্স স্টার্চ’ বা প্রতিরোধী শ্বেতসার।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরোপুরি হজম না হওয়া কার্বোহাইড্রেট যখন বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়, তখন সেখানে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলোর মাধ্যমে একটি গাঁজন (ফার্মেন্টেশন) প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই গাঁজন প্রক্রিয়া প্রাকৃতিকভাবে হাইড্রোজেন, মিথেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাস তৈরি করে। শরীরে এই গাঁজন প্রক্রিয়া অতিরিক্ত মাত্রায় ঘটলেই পেট ফাঁপা, পেটে অস্বস্তি এবং গ্যাসের সমস্যা তৈরি হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, রেজিস্ট্যান্স স্টার্চ আসলে অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের (মাইক্রোবায়োটা) পুষ্টি সরবরাহ করে ‘প্রিবায়োটিক’ হিসেবে কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পেটের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। তবে এই গাঁজন প্রক্রিয়ার কারণে সাময়িকভাবে পেটে অতিরিক্ত গ্যাস জমতে পারে।
ডা. প্রকাশ বলেন, “শুধু আলু নয়; ডাল, মটরশুঁটি, মুলো কিংবা দুগ্ধজাত খাবারও পেটে গ্যাসের সমস্যা করতে পারে। অনেক সময় আলুর রান্নার পদ্ধতি এবং এর সাথে কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, তার ওপরও গ্যাসের লক্ষণ নির্ভর করে। যেমন, আপনি যদি মসুর ডাল আর আলু একসাথে খাওয়ার পর পেটের সমস্যায় পড়েন, তবে পরের বার এই দুটি খাবার আলাদা আলাদা দিনে খেয়ে পরীক্ষা করুন। তাহলে বুঝতে পারবেন ঠিক কোন খাবারটিতে আপনার সমস্যা হচ্ছে।” এছাড়া ভাজা আলুতে (ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিপস) ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় তা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে, যা অনেকের ব্লোটিংয়ের অনুভূতি বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার অভ্যাস পেটে গ্যাস জমার অন্যতম বড় কারণ। খাবার খুব ভালোভাবে চিবিয়ে এবং ধীরে ধীরে চিবিয়ে খেলে এই সমস্যা অনেকটাই কমে যায়। এছাড়া হঠাৎ করে খাদ্যাভ্যাসে ফাইবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলে পাচনতন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। তাই ফাইবারযুক্ত খাবার ধীরে ধীরে খাদ্যতালিকায় যোগ করা উচিত।
চিকিৎসকদের মতে, পেটে গ্যাস হওয়া বা পেট ফাঁপা ভাব সাধারণত কোনো বড় রোগ নয়। তবে এই সাধারণ সমস্যার সাথে যদি নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়, তবে তা একদমই অবহেলা করা উচিত নয়: হঠাৎ এবং ক্রমাগত ওজন হ্রাস পাওয়া। দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র পেটে ব্যথা। ঘন ঘন ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য। মলের সাথে রক্ত যাওয়া। বারবার বমি হওয়া।
এই জাতীয় উপসর্গ দেখা দিলে কিংবা সাধারণ পেটের অস্বস্তি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :