ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
স্বৈরাচারী শাসনের অনুশোচনাহীন ৭৭ বছরে আওয়ামী লীগ

অফলাইনে নিষেধাজ্ঞা ও ঝটিকা মিছিল, অনলাইনে অপপ্রচারের ছড়াছড়ি

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ২৩, ২০২৬, ১২:০৩ পিএম

অফলাইনে নিষেধাজ্ঞা ও ঝটিকা মিছিল, অনলাইনে অপপ্রচারের ছড়াছড়ি

প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছর পূর্ণ করল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে দলটির এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এসেছে এমন এক নজিরবিহীন সময়ে, যখন বিগত স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে দলটির সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচি আইনিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে প্রায় দুই বছর ধরে। দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিপর্যস্ত ও অস্তিত্ব সংকটে পড়া দলটির মাঠের রাজনীতি এখন কেবলই ঝটিকা মিছিল আর সামাজিক মাধ্যমে ট্রল-অপপ্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে আজ অব্দি রাজনীতির মূল মাঠে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানকে ঘিরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বিচার গণহত্যা ও দমনপীড়ন নিয়ে দলটির মধ্যে এখন পর্যন্ত ন্যূনতম কোনো অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনার মানসিকতা দেখা যায়নি যা দলটির মূলধারার রাজনীতিতে ফেরা কিংবা জনসমর্থন পাওয়ার পথকে দিন দিন আরও অসম্ভব করে তুলছে।

বিশ্লেষকদের মতে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখন ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় পার করছে। গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। তার আগে, মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করলেও দলটির ভাগ্যে কোনো রাজনৈতিক ছাড় মেলেনি। উল্টো নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের সেই নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি আইন হিসেবে সর্বসম্মতভাবে অনুমোদিত হয়। ফলে দেশের ভেতরে আইনগতভাবে দলটির কোনো কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই।

দেশের ভেতরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের কিছু জায়গায় দলটির নেতা-কর্মীদের আকস্মিক ঝটিকা মিছিল বের করতে দেখা গেছে। তবে মিছিলের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দলটির গ্রেফতার হওয়া নেতা-কর্মীদের সংখ্যাও।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সাবেক আওয়ামী লীগ সদস্য বিপ্লব হাসান পলাশ অবশ্য দাবি করেছেন, এগুলো তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞের "ছোট একটা অংশ"। তিনি দাবি করেন, তাদের একক শীর্ষ নেতৃত্ব (শেখ হাসিনা) বিদেশ থেকেই সারাদেশের তৃণমূলের সাথে যুক্ত আছেন এবং নতুন করে দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ সাজাচ্ছেন। বিদেশে পলাতক ও দেশের কারাগারে থাকা নেতাদের শূন্যস্থান পূরণের মাধ্যমে দলকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান। একইভাবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমও দাবি করেন, তারা জনগণের সাথে যুক্ত হতে বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন।

তবে রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা দলটির নেতাদের এই দাবিকে মাঠের বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিহীন বলে মনে করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন: “দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের প্রায় সবাই হয় কারাগারে, না হয় দেশের বাইরে পালিয়ে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে দল পরিচালনার কৌশল কী হবে তা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই চরম অস্পষ্টতা ও সংকট রয়েছে। সে কারণেই তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটা উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো ভাব আর কেবলই অবাস্তব ভাবাবেগ কাজ করছে।”

মাঠের রাজনীতি অবরুদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মূল তৎপরতা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই অনলাইন প্রচারণাও সুসংগঠিত নেতৃত্বের অভাবে হিতে বিপরীত হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে দলটির প্রচারণার বড় অংশ জুড়েই থাকছে ভুয়া তথ্য, গুজব এবং রুচির গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়া কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট। এটি সাধারণ মানুষের কাছে জনসংযোগের বদলে দলটিকে আরও বেশি জনবিচ্ছিন্ন ও ঘৃণার পাত্রে পরিণত করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনীতি বিশ্লেষক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, “নেতৃত্ব সুসংগঠিত না থাকায় তারা তৃণমূলের মতামত নিয়ে সাংগঠনিক বিন্যাস করতে পারছে না। কোনো ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক অপপ্রচারে না গিয়ে, মূলধারার গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে প্রথমে আইনি প্রক্রিয়াই মোকাবিলা করতে হবে।”

নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন রাজনৈতিক দৃশ্যপট কিছুটা শিথিল হতে পারে। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মাফিয়া ও ফ্যাসিবাদী চক্রকে তারা কোনো ছাড় দেবে না। আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের নাশকতার অপচেষ্টা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চরম সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

কেবল ঢাকা রাজধানীতেই মোতায়েন করা হয়েছে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কায় ২২ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি জেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের স্পষ্ট জানান, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি, তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ মাফিয়া বাহিনী আওয়ামী লীগের কিছু অপতৎপরতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা আমাদের নজরে এসেছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ও অপতৎপরতা কঠোরভাবে ‘অ্যাড্রেস’ করার জন্যই আমাদের সমস্ত বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, সহসাই আওয়ামী লীগের এই অন্ধকার দৃশ্যপটের পরিবর্তন হচ্ছে না। অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ উল্লেখ করেন, সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের আইন পাস হওয়া প্রমাণ করে ক্ষমতাসীন বিএনপি এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থেকেই নিয়েছে। আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘসূত্রিতা পার করে আগামী অন্তত পাঁচ বছরের মধ্যে দলটির রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।

অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলামের মতে, ক্ষমতার মসনদে বসে বিএনপি যখন রাষ্ট্র ও সব প্রতিষ্ঠান নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন তারা তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কোনো ফাঁকা মাঠ বা ছাড় দেবে না। আওয়ামী লীগকে যদি কোনোদিন ফিরতেই হয়, তবে তাদের আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি বর্তমানের সব রাজনৈতিক দলের সাথে নতুন করে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, যা এই মুহূর্তে সুদূরপরাহত। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!