ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

ডুবল ঢাকা, পরীক্ষা স্থগিত; বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৬ মৃত্যু, বিপাকে ৯ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: জুলাই ১২, ২০২৬, ১১:২৭ এএম

ডুবল ঢাকা, পরীক্ষা স্থগিত; বন্যা ও পাহাড়ধসে ৪৬ মৃত্যু, বিপাকে ৯ লাখ মানুষ

টানা ও বিরামহীন অতি ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে রাজধানী ঢাকা ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা কক্সবাজারসহ সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। আজ রোববার (১২ জুলাই) সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসের ভোর থেকেই ঢাকা মহানগরীতে শুরু হয় মুষলধারে ঝুম বৃষ্টি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় রাজধানীতে রেকর্ড ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা চলতি জুলাই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই অভূতপূর্ব বৃষ্টির কারণে ঢাকার গ্রিন রোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, বিজয়নগর, কারওয়ান বাজার, মালিবাগ ও বিজয় সরণিসহ অধিকাংশ এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে গেছে।

তীব্র জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বেইলি রোড শাখা, মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের শেওড়াপাড়া শাখা-৩, ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের গ্রিন রোড শাখা এবং শংকরের নালন্দা স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আজকের অর্ধবার্ষিক, প্রাক-নির্বাচনী ও ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

রাস্তায় কোমরসমান পানির কারণে গণপরিবহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে এবং অনেক সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ির ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাঝরাস্তায় আটকে থাকায় মিরপুর থেকে মৌচাক পর্যন্ত মাইলের পর মাইল তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পেরে চরম নাভিশ্বাসে পড়েছেন অফিসগামী সাধারণ মানুষ ও চাকরিজীবীরা।

রাজধানীর এই চরম স্থবিরতার মধ্যেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যা ও পাহাড়ধস পরিস্থিতি এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়ায় বানের পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে আরও দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন ঝিলংজা ইউনিয়নে এক প্রলয়ংকরী পাহাড়ধসে বসতঘর মাটিচাপা পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিভাগ জুড়ে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগজনিত কারণে মোট প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ জনে।

সর্বশেষ শনিবার রাতে চকরিয়ার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় মাতামুহুরী নদীর তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে সুজিত দাস নামের ১২ বছরের এক কিশোর নিখোঁজ রয়েছে, যাকে উদ্ধারে চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ ডুবুরি দল তলব করা হয়েছে। একই দিন পেকুয়া উপজেলার বলিরপাড়ায় ঘরের ভেতর হাঁটুসমান পানি ঢুকে পড়ায় লোকালয়ের স্রোতে ভেসে গিয়ে ১৯ মাসের শিশু মুশফিকুর রহিমের করুণ মৃত্যু হয়।

এছাড়া কক্সবাজার শহরের কলাতলী চন্দ্রিমা ঝিরঝিরিপাড়ায় মুজিবুর রহমানের ঘরের ওপর ৪০ ফুট উঁচু পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ায় তাঁর স্ত্রী রোজিনা আক্তার মাটির নিচে চাপা পড়ে মারা যান, যদিও অলৌকিকভাবে তাঁর স্বামী ও তিন সন্তান জীবিত উদ্ধার পান।

ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ আলম জানান, পাহাড়ি এলাকার অসংখ্য ঘরবাড়ি এখনও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে, কিন্তু বারবার মাইকিং করার পরও মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাচ্ছে না।

সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে এ পর্যন্ত বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি হয়েছেন প্রায় ৮ লাখ ৬৭ হাজার মানুষ। চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চলের অন্তত ১৫০টি গ্রাম এখনও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও শাহীন দেলোয়ার এবং পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুর্গতদের জন্য খোলা ৯৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার বিতরণ ও স্লুইস গেটগুলো সচল রাখতে প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করে এ পর্যন্ত ২০০ টন চাল ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ২৪২ কিলোমিটার সড়ক পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং টেকনাফ-সেন্টমার্টিনসহ কুতুবদিয়া ও মহেশখালী নৌপথে টানা আট দিন ধরে সব ধরনের নৌযান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিকুল নেওয়াজ কবীর সতর্ক করে জানিয়েছেন, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যার ফলে দেশের চলমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি এবং উপকূলীয় পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন করে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঝুঁকি রয়েছে। সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় এলাকার জন্য বর্তমানে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!