গাছের ডালে বসে এক হাত দিয়ে গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে আছেন, আর অন্য হাতে থাকা মোবাইল উঁচিয়ে নেটওয়ার্ক খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। আম গাছে উঠে একজন শিক্ষকের মোবাইল নেটওয়ার্ক খোঁজার এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর ওই ব্যক্তি রাঙামাটি জেলার সীমান্তবর্তী বাঘাইছড়ি উপজেলার পাকুজ্জোছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তাহের। মূলত অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষক হাজিরা নিশ্চিত করতেই নিরুপায় হয়ে তিনি গাছে উঠেছিলেন।
দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকরা সময় মতো উপস্থিত হচ্ছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে সম্প্রতি একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত সোমবার (১৫ জুন) থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রমে শিক্ষকদের প্রতিদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে উপস্থিতির তথ্য ও ছবি পাঠানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কিন্তু প্রথম দিনেই এই নিয়ম পালন করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েন দুর্গম পাহাড়ের শিক্ষকরা। প্রধান শিক্ষক আবু তাহের জানান, পাহাড় ঘেরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে হওয়ায় তাঁর স্কুলটি প্রায় তিন থেকে চারশো ফুট নিচে অবস্থিত, যেখান থেকে মোবাইলের সাধারণ নেটওয়ার্ক পাওয়াই দুষ্কর। সেখানে ব্রডব্যান্ড বা অন্য কোনো ইন্টারনেট সুবিধা নেই।
অভিজ্ঞতা জানিয়ে শিক্ষক আবু তাহের বলেন, “সকালে স্কুলে এসে প্রথমে ছাদ থেকে চেষ্টা করেছি। পরে পাহাড়ে উঠেও নেটওয়ার্ক না পেয়ে নিরুপায় হয়ে আমগাছের ডালে উঠি। এই সময় কে বা কারা হয়ত ভিডিওটা করে অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছে।” তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, আমগাছে উঠেও ইন্টারনেট সংযোগ না পাওয়ায় তিনি ছবি পাঠাতে ব্যর্থ হন। শেষমেশ মোবাইল নেটওয়ার্কের সাধারণ টেক্সট মেসেজের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে হাজিরার তথ্য নিশ্চিত করেন তিনি।
এই ঘটনায় কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (চলতি দায়িত্ব) মো. কফিল উদ্দিন বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় নেটের সমস্যা আছে এটা বাস্তব বিষয়। কিন্তু কোনো শিক্ষককে গাছে চড়ে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।”
তিনি জানান, কর্মসূচির প্রথম দিনে জেলার ৭০৮টি স্কুলের মধ্যে ৫৩৮টি স্কুলের শিক্ষক হাজিরার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকায় বাকি ১৭০টি অর্থাৎ প্রায় ২৪ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি। যেসব এলাকায় নেটওয়ার্কের সমস্যা রয়েছে, ইতোমধ্যে সেই সব প্রতিষ্ঠানের তালিকা চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ‘শিক্ষা ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন’ ও ডিজিটাল সক্ষমতা বৃদ্ধির বড় বড় দাবি করা হলেও, এই একটি ভিডিও প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ভঙ্গুর কাঠামোর আসল চিত্রটি সামনে এনেছে। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি একদিকে যেমন হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে সরকারের এমন একতরফা নির্দেশনা নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন নেটিজেনরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খন্দকার দীন মোহাম্মদ জানান, প্রথম দিনে সারা দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ শিক্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত না থাকায় বা তথ্য না পৌঁছানোয় প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষক প্রথম দিনেই অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
এই নতুন মনিটরিং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, “আপনি কোনো একটা নির্দেশনা চালু করতে চাইলে তার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের মোবাইল ডেটা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে?”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষকদের উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা না দিয়ে কেবল প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে শিক্ষকদের কাজের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা ও সন্তুষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করা বেশি জরুরি।


আপনার মতামত লিখুন :