ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬, ১২ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
নন্দিনীর নিভে যাওয়া প্রদীপ ও ফলিমারী রণক্ষেত্র

লালমনিরহাটে শিশু হত্যার নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আদ্যোপান্ত

আসাদুজ্জামান সাজু, লালমনিরহাট থেকে

প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬, ০৭:৪৪ পিএম

লালমনিরহাটে শিশু হত্যার নেপথ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আদ্যোপান্ত

একটি সাত বছরের শিশুর খিলখিল হাসিতে যে উঠোন দিনরাত মুখরিত থাকার কথা ছিল, সেখানে আজ শুধুই কান্নার রোল, বুকফাটা আর্তনাদ। বই-খাতা হাতে সহপাঠীদের সাথে স্কুলে যাওয়ার বয়সে নিথর দেহে, বস্তাবন্দী হয়ে মাটির নিচে চাপা পড়তে হলো ছোট্ট নন্দিনীকে। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে প্রথম শ্রেণির এক অবুজ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার এই নির্মম ঘটনা কেবল একটি পরিবারকে ধ্বংস করেনি, কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো জনপদের বিবেককে। ক্ষোভে, অভিমানে আর দ্রুত বিচার পাওয়ার আকুতিতে আজ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে গোটা গ্রাম।

নিহত নন্দিনী রানী (৭) আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নলনী বর্মণের মেয়ে। সে স্থানীয় একটি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত সোমবার (১৫ জুন) বিকেল থেকে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যায় শিশুটি। চারদিকে স্বজনদের আকুলতা আর খোঁজাখুঁজির অবসান ঘটে মঙ্গলবার (১৬ জুন) সকালে। তবে সেই অবসান কোনো আনন্দের বার্তা নিয়ে আসেনি, এনেছে এক চরম দুঃসংবাদ। বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয় নন্দিনীর বস্তাবন্দী মরদেহ। যে হাতগুলো দিয়ে সে কদিন আগেও খেলা করত, পাড়া মাতিয়ে বেড়াত, সেই হাতগুলো আজ চিরতরে স্থির।

হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত তদন্তে নামে আদিতমারী থানা পুলিশ। পারিপার্শ্বিক তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তারা পারিবারিক সম্পর্কের চাচা বিধানকে (১৯) এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে শনাক্ত করে এবং ঘটনাস্থল থেকেই তাকে আটক করতে সক্ষম হয়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, শিশুটিকে ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ বস্তাবন্দী করে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল।

"ফলিমারী গ্রামের ভুট্টাক্ষেতটি হয়তো আগামী মৌসুমে আবার সবুজ হবে, কিন্তু নলনী বর্মণের ঘরের যে প্রদীপটি চিরতরে নিভে গেল, তা আর কোনোদিন জ্বলবে না।"

এই চরম নিষ্ঠুরতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি স্থানীয় এলাকাবাসী। স্বজন হারানোর বেদনা আর ঘাতকের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিমেষেই রূপ নেয় গণবিক্ষোভে। ঘাতক বিধানকে পুলিশ যখন থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলছিল, ঠিক তখনই উত্তেজিত জনতা পুলিশের পথরোধ করে এবং আসামিকে গণপিটুনি দেওয়ার জন্য ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ক্ষুব্ধ জনতা একপর্যায়ে ঘাতক বিধানের বাড়িঘরে চড়াও হয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে অপরাধীর বাড়ি।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহঃ রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান আসাদ এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদের নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সবার মনে।

প্রশাসন যখন অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে আসামিকে কঠোর নিরাপত্তায় নিয়ে ফিরছিল, তখন বিক্ষুব্ধ জনতা আচমকা প্রশাসনের গাড়িবহর লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। ক্ষুব্ধ জনতার হামলায় জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং ইউএনও’র ব্যবহৃত সরকারি গাড়িগুলো দুমড়েমুচড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে পুরো এলাকাটি যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ধোঁয়া আর চিৎকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে চারপাশ। এই দফায় দফায় সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পরবর্তীতে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়।

এদিকে, ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং দায়িত্ব পালনে অবহেলার দায়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল ইসলামকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়েছে।

গ্রামের মোড়ে মোড়ে এখন পুলিশের বুটের আওয়াজ, আকাশে-বাতাসে পোড়া বাড়ির গন্ধ। কিন্তু এই সবকিছুর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে এক বাবার বুকফাটা আর্তনাদ আর এক মায়ের শূন্য কোল। স্তব্ধ ও থমকে যাওয়া এই গ্রামের প্রতিটি মানুষের একটাই চাওয়া এই ধিক্কারজনক নির্মমতার যেন দৃষ্টান্তমূলক এবং দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিত করা হয়।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান আসাদ জানিয়েছেন, "আসামিকে আমরা আইনের আওতায় এনেছি। তবে সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং পুলিশের গাড়িবহরে বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হবে।" বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। 

আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে শিশু হত্যা; আসামি আটকে রণক্ষেত্র: আহত ৩০, ওসি প্রত্যাহার    

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!