ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

ফুটবল উন্মাদনা বনাম পতাকা বিধিমালা: সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ২২, ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

ফুটবল উন্মাদনা বনাম পতাকা বিধিমালা: সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়

বিশ্বকাপ ফুটবল কিংবা বৈশ্বিক কোনো ক্রীড়া আসর এলে আমাদের দেশে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। আকাশছোঁয়া উন্মাদনায় মেতে ওঠে আপাময় জনসাধারণ। প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন জানাতে গিয়ে দেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়ির ছাদ, গাছপালা, এমনকি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বারান্দাও ছেয়ে যায় ভিনদেশি পতাকায়। খেলাকে ভালোবাসার এই যে আবেগ, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু এই আবেগ যখন রূপ নেয় অতি-উন্মাদনায় এবং তা যখন আমাদের দেশের প্রচলিত আইন ও জাতীয় পতাকার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে, তখন নাগরিক হিসেবে আমাদের থমকে দাঁড়ানো এবং ভাবার সময় এসেছে।

অনেকেই হয়তো জানেন না বা অবহেলাবশত খেয়াল করেন না যে, বাংলাদেশে ভিনদেশি পতাকা ওড়ানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২’ (The People‍‍`s Republic of Bangladesh Flag Rules, 1972)-এর বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনৈতিক মিশন (যেমন: হাই কমিশন, এম্বাসি) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার দপ্তর ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি বা স্থানে ভিন্ন কোনো দেশের পতাকা উত্তোলন করতে হলে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ ও লিখিত অনুমোদন গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমরা কি এই অনুমোদনের তোয়াক্কা করছি?

পতাকা বিধিমালার মূল কথা হলো বাংলাদেশে এককভাবে কোনো বিদেশি পতাকা ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে বিশেষ কোনো আন্তর্জাতিক আয়োজন বা সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে যদি ওড়াতেই হয়, তবে তার সঙ্গে অবশ্যই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাও ওড়াতে হবে। এখানেই শেষ নয়, এর সুনির্দিষ্ট কিছু জ্যামিতিক ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল রয়েছে। দুটি পতাকা কোনোভাবেই একই খুঁটি বা স্তম্ভে বাঁধা যাবে না, তাদের জন্য দুটি পৃথক খুঁটি থাকতে হবে।

পতাকার আকার বা সাইজ হতে হবে একদম সমান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পতাকার অবস্থান; আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সম্মানসূচক ডানদিকের প্রধান খুঁটিতে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং বামদিকে বা কিছুটা নিচে থাকবে বিদেশি পতাকা। একই সাথে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই পতাকা ওড়ানো যাবে এবং সূর্যাস্তের আগেই তা অত্যন্ত সম্মানের সাথে নামিয়ে ফেলতে হবে।

দুর্ভাগ্যবশত, ক্রীড়া উৎসবের দিনগুলোতে আমরা এর উল্টো চিত্রই বেশি দেখতে পাই। একটি জরাজীর্ণ বাঁশের খুঁটিতে কেবল ভিনদেশি পতাকা পতপত করে উড়ছে, অথচ সেখানে বাংলাদেশের পতাকার কোনো অস্তিত্বই নেই। কোথাও আবার বাংলাদেশের পতাকার চেয়ে ভিনদেশি পতাকার আকার দ্বিগুণ বা তিনগুণ বড় করে তৈরি করা হচ্ছে। অনেকে আবার নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল বা বাইসাইকেলেও ভিনদেশি পতাকা জুড়ে দিচ্ছেন, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জাতীয় পতাকা কেবল এক টুকরো কাপড় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্তে ভেজা আমাদের স্বাধীনতা, গৌরব এবং অক্ষুণ্ণ সার্বভৌমত্বের পরম প্রতীক। ভিনদেশি কোনো দলকে সমর্থনের নামে নিজের দেশের প্রতীককে ছোট করা বা অপমান করা কোনো সচেতন ও দেশপ্রেমিক নাগরিকের কাজ হতে পারে না। আমাদের সংবিধানেও জাতীয় পতাকার অবমাননাকে রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

আমরা অবশ্যই ফুটবল বা অন্যান্য খেলা উপভোগ করব, প্রিয় দলের জয় উদ্‌যাপন করব। কিন্তু তা যেন কখনোই আমাদের জাতীয় আত্মমর্যাদাকে ছাপিয়ে না যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যেমন উচিত যত্রতত্র নিয়মবহির্ভূত বিদেশি পতাকা ওড়ানো বন্ধে ভূমিকা রাখা, তেমনি সাধারণ নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে।

আসুন, খেলার মাঠে আমরা বিশ্বনাগরিক হই, কিন্তু ঘরের ছাদে যেন আমরা সবার আগে একজন গর্বিত বাংলাদেশি থাকি। ভিনদেশি পতাকার ওপরে বা সমান্তরালে যেন সবসময় সগৌরবে মাথা উঁচু করে ওড়ে আমাদের প্রিয় লাল-সবুজ।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!