হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হওয়ার সময় সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জেরে তেহরানের ওপর নতুন করে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে, ওই হামলার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো দুই দেশের মধ্যে এমন ভয়াবহ পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটল, যা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে খাদের একেবারে কিনারায় নিয়ে গেছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আইআরজিসি বাহিনী এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের সাইপ্রাসের ওই জাহাজে সরাসরি হামলা চালিয়েছে। ইঞ্জিন রুমের মারাত্মক ক্ষতির কারণে জাহাজটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখতে ব্যর্থ হয়। এই ভয়াবহ ঘটনায় জাহাজটির একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) নিশ্চিত করেছে যে, হামলার মুখে আতঙ্কিত নাবিকরা মূল জাহাজটি ছাড়তে বাধ্য হন এবং বর্তমানে তারা একটি লাইফবোটে অবস্থান করছেন।
আইআরজিসি দাবি করেছে, অনুমোদিত পথ থেকে সরে গিয়ে আইন লঙ্ঘনকারী জাহাজটি নিজস্ব ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে দিয়েছিল। বারবার নির্দেশ অমান্য করায় সতর্কতামূলক গুলি করে সেটিকে থামানো হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের নৌ চলাচল বন্ধ থাকবে। এই প্রণালি বন্ধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং ওই অঞ্চলের নতুন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলাগুলোর পর সমঝোতা স্মারক মেনে চলার প্রমাণ দিতে ইরানকে আরও একটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা আবারও ব্যর্থ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সেন্টকমের এই বিবৃতি শেয়ার করে লিখেছেন, ইরান চরম একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এখন তাদের এর চড়া মূল্য দিতে হবে। এর আগে ওমানের জলসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের সুপারিশ করা রুট অতিক্রম করার সময় তিনটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার জেরে মার্কিন বাহিনী ইরানে ধারাবাহিক হামলা চালায়, যাতে ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হয়। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপরও পাল্টা হামলা চালিয়েছিল ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের এসব হামলার অর্থ হলো চলমান যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণ শেষ।
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল হামলায় নিহত পিতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফনের পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে প্রতিশোধের কড়া বার্তা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, দুই যুদ্ধাপরাধী ও কলঙ্কিত হত্যাকারীদের কাছ থেকে শহীদ নেতাদের রক্তের বদলা নেওয়া এখন পুরো জাতির ইচ্ছা। খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া ক্ষুব্ধ ইরানিরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করেন।
এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব এলাকা সম্পূর্ণ ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন করে দেবে।
নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের হত্যা তালিকার এক নম্বরে রয়েছেন। যদিও মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান পর্দার আড়ালে আমেরিকান কর্মকর্তাদের জানিয়েছে যে ট্যাংকারে হামলাগুলো একটি অভ্যন্তরীণ বিপথগামী গোষ্ঠীর ভুল ছিল। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এই উত্তেজনার প্রশমন দেখছেন না।


আপনার মতামত লিখুন :