ঢাকা সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News

নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যা: নিহত বেড়ে ৬২৬, মর্গ উপচে পড়ায় গণসৎকারের প্রস্তুতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৯, ২০২৬, ১১:১৩ এএম

নেপালে প্রলয়ংকরী বন্যা: নিহত বেড়ে ৬২৬, মর্গ উপচে পড়ায় গণসৎকারের প্রস্তুতি

হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি। নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী বন্যার ধাক্কা কাটতে না কাটতেই এবার ভূমিধসে তৈরি হওয়া হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ায় দেখা দিয়েছে নতুন ঝুঁকি। এতে নিখোঁজ প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বেঁচে ফেরার আশা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত ৬২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত মরদেহের চাপে হাসপাতালগুলোর মর্গে জায়গা ফুরিয়ে আসায় এখন অশনাক্ত মরদেহগুলোর ছবি ও ডিএনএ নমুনা রেখে গণসৎকারের প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।

হিমালয়ের বুকে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এর মধ্যেই ভূমিধসে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে পানি উপচে পড়ায় ত্রিশূলী উপত্যকায় উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। কয়েক ঘণ্টা পর আবারও উদ্ধারকাজ চালু হলেও নতুন বিপদের শঙ্কা এখনো কাটেনি।

দুর্গত এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, "বন্যা আমাদের জন্য চরম সংকট তৈরি করেছে। তরুণদের পক্ষেই যেখানে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া কঠিন, সেখানে বয়স্কদের অবস্থা কতটা শোচনীয় তা সহজেই অনুমেয়।"

নেপালের এই স্মরণকালের ভয়াবহ দুর্যোগে এখন পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নেপালিদের পাশাপাশি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডার নাগরিক রয়েছেন। শুধু ভারতেরই তিন শতাধিক তীর্থযাত্রী ও পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন।

এ ছাড়া সীমান্তের তিব্বত অংশে সাড়ে পাঁচ শতাধিক চীনা নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে এপি। নিখোঁজ স্বজনের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা ছবি হাতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ছুটছেন।

নুয়াকোট, ধাদিং, গোর্খা, তানাহুন, চিতওয়ান ও নাওয়ালপারাসিসহ বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে। পানির প্রবল স্রোতে অনেক মরদেহ দুর্ঘটনাস্থল থেকে বহু দূরে ভেসে যাওয়ায় নিখোঁজদের সন্ধান ও মরদেহ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। মর্গে জায়গা না থাকায় কয়েকটি পরিত্যক্ত সরকারি ভবনকে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার।

চিতওয়ান জেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। জেলার মর্গগুলোতে একসঙ্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব হলেও শুধু এই জেলাতেই উদ্ধার হয়েছে ১৮৬টি মরদেহ। বাধ্য হয়ে পরিত্যক্ত ভবনে ২৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

শনাক্ত না হওয়া মরদেহগুলো গণসৎকারের আগে বিভিন্ন দিক থেকে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে পরে কোনো পরিবার স্বজনের খোঁজে এলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ দুই সপ্তাহ মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর মধ্যে স্বজনেরা এসে মরদেহ শনাক্ত করতে না পারলে তা গণসৎকার করা হতে পারে।

নেপালের এই পাহাড়ধস ও বন্যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পৌঁছেছে। শুক্রবার ভারতের উত্তর প্রদেশের মহারাজগঞ্জ ও কুশীনগর জেলার নদী থেকে সাতটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রবল স্রোতে অন্তত ৭০ কিলোমিটার দূরে ভেসে আসা এসব মরদেহ নেপালের বিপর্যয়ে নিহতদেরই।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিপর্যয় হিমালয়ের বাড়তে থাকা ঝুঁকিরই আরেকটি সুস্পষ্ট বার্তা। জলবায়ু পরিবর্তন ও পাহাড়ি পরিবেশের অস্থিতিশীলতা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!