হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপালে চতুর্থ দিনের মতো উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে নতুন করে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টিপাত উদ্ধারকাজ ব্যাহত করার পাশাপাশি নতুন করে বন্যার শঙ্কা তৈরি করেছে। এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩৩ জনে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভয়াবহ এই বন্যায় চীন ও নেপাল মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাত শতাধিক বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজের তালিকায় নতুন করে বিদ্যুৎ অবকাঠামো প্রকল্পে কর্মরত ৯৩৩ জন কর্মীর নাম যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রসুয়া জেলার ত্রিশূলী ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে আটকে পড়েছেন শতাধিক শ্রমিক। তাঁদের উদ্ধারে শনিবার ভোর থেকে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খোলার কাজ জোরদার করেছে সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ এবং নেপাল পুলিশের একটি যৌথ দল।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তবে ঠিক কতজন ভেতরে আটকে আছেন, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি। আকস্মিক বন্যার পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
উত্তর নেপালজুড়ে আবারও ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছানো দুষ্কর হয়ে পড়েছে উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য। প্রধান সড়ক ও সেতুগুলো ভেঙে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বেঁচে যাওয়া মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বৃষ্টির কারণে নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের বিষয়ে সতর্ক করেছে সেনাবাহিনী।
নেপালের উদ্ধারকর্মীরা বিপর্যস্ত এলাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। ত্রাণসহায়তায় ভারতীয় একটি দলও ইতিমধ্যে ত্রিশূলীতে পৌঁছেছে।
তিব্বত অংশে ধ্বংসযজ্ঞের বেশ কিছু ছবি প্রকাশ করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ, যেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অংশে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বুধবারের আকস্মিক বন্যার ফলে সৃষ্ট একটি হ্রদ থেকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় চীন আপাতত উদ্ধারকাজ স্থগিত রেখেছে। তবে আবহাওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সামনের কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে উদ্ধারকাজে বাধার পাশাপাশি ভূমিধস ঘটতে পারে।
কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের ছবিতে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যা ও কাদাধসের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। গত মাসে তোলা ছবিতে তিমুরে এলাকার নদীর তীর ঘেঁষে যেসব রঙিন ভবন দেখা যাচ্ছিল, বর্তমানে সেখানে কেবল দু-একটি ভবন ছাড়া বাকি সবকিছু কাদা, পানি ও পাথরের স্তূপে তলিয়ে গেছে। ত্রিশূলী নদীর তীরে অবস্থিত রসুয়াগড়ী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকার কোনো চিহ্নই এখন আর অবশিষ্ট নেই।
চিতওয়ান জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গত বুধবারের বন্যায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র চারটির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ২২৯টি মরদেহ বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ও হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তবে মরদেহগুলো পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা থেকে সংক্রমণ বা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় প্রতিটি মরদেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে রেকর্ড রাখার পর গণসৎকারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শনিবার থেকে ভারতপুর মহানগরীর দেবঘাটের একটি উন্মুক্ত স্থানে এসব মরদেহ সমাহিত করা হবে।
নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান হওয়ায় প্রতিবছর হাজারো তীর্থযাত্রী এখানে আসেন। বিশেষ করে ভারতীয় পর্যটকেরা নেপাল হয়ে তিব্বতের কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যান। বন্যায় নিখোঁজ পর্যটকদের একটি বড় অংশই ভারতীয় তীর্থযাত্রী। এ ছাড়া ট্রেকিংয়ের জন্য জনপ্রিয় রসুয়া এলাকাতেও অনেক পর্বতারোহী নিখোঁজ রয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন :