ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News

যান্ত্রিকতার শিকল ভেঙে নদীর বুকে ‘ওয়ান জিম’: ফুটবল, আড্ডা আর বিনোদনে মাতোয়ারা এক দিন

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৫, ২০২৬, ০২:৩৫ পিএম

যান্ত্রিকতার শিকল ভেঙে নদীর বুকে ‘ওয়ান জিম’: ফুটবল, আড্ডা আর বিনোদনে মাতোয়ারা এক দিন

শহুরে জীবনের কোলাহল, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলা আর প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিন সব মিলিয়ে আধুনিক যান্ত্রিক জীবন আমাদের প্রতিনিয়ত ক্লান্ত করে তোলে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের চাপ, যানজট, ডেডলাইনের তাড়া আর হাজারো দায়িত্বের মাঝে নিজের জন্য একটুখানি প্রশান্তির সময় বের করা যেন রীতিমতো এক সংগ্রাম।

শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে অনেকেই নিয়মিত জিমে যান, ঘাম ঝরান, ভারী ওজন তোলেন আর ট্রেডমিলে মাইলের পর মাইল ছোটেন। কিন্তু সুস্থতা মানেই তো কেবল সুঠাম পেশি বা মেদহীন শরীর নয়; সুস্থতা হলো শরীর ও মনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। মানসিক প্রশান্তি, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিখাদ আনন্দ ছাড়া শারীরিক সুস্থতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আধুনিক ফিটনেসের এই গভীর দর্শনকে বুকে ধারণ করেই ‘ওয়ান জিম’-এর সদস্যদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল দিনব্যাপী এক বর্ণিল ও আনন্দমুখর নৌ-ভ্রমণের। জিমের চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে, যান্ত্রিক শহরের ইট-পাথরের খাঁচা থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির বিশালতায় নিজেদের হারিয়ে ফেলার এই অনন্য সুযোগ পেয়েছিলেন জিমের সদস্যরা।

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত এই নৌ-ভ্রমণটি কেবল একটি সাধারণ আউটিং ছিল না; বরং এটি ছিল একঘেয়ে জীবনের ডায়েরিতে লেখা এক অবিস্মরণীয় আনন্দ-কাব্য। আর চমৎকার ও সময়োপযোগী এই আয়োজনের নেপথ্যের রূপকার ছিলেন ওয়ান জিমের স্বত্বাধিকারী হোসাইন মেহেদী।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালের নরম ও স্নিগ্ধ আলো গায়ে মেখে শুরু হয় ওয়ান জিম পরিবারের এই বিশেষ জলযাত্রা। নির্ধারিত সময়ের আগেই নদীর ঘাটে এসে জড়ো হতে থাকেন জিমের সদস্যরা। প্রতিদিন যাদের জিমের ফ্লোরে ভারী ডাম্বেল হাতে বা আয়নার সামনে গম্ভীর মুখে কসরত করতে দেখা যায়, তাদের চোখেমুখে আজ ছিল শিশুর মতো বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর কৌতূহল।

নৌকার নোঙর তোলার সঙ্গে সঙ্গেই যেন শহরের সব ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর পিছুটান ঘাটে রয়ে গেল। ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি যখন নদীর শান্ত ও রূপালি জল চিরে ধীরলয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল, তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো সবার মনে। নদীর স্নিগ্ধ শীতল বাতাস, চারপাশের দিগন্তবিস্তৃত সবুজ প্রকৃতি আর শরতের কাছাকাছি সময়ের নীল আকাশ মিলেমিশে এক অপূর্ব ক্যানভাস তৈরি করেছিল। নদীর ঢেউয়ের ছন্দের সঙ্গে যেন নতুন করে স্পন্দিত হতে শুরু করল প্রতিটি প্রাণ।

এই নৌ-ভ্রমণের সবচেয়ে বড় চমক ও উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নদীর বিস্তীর্ণ বালুচরে আয়োজিত প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। নৌকা কিছুক্ষণ চলার পর চমৎকার এক নির্জন চরে নোঙর করা হয়। নরম বালুচরে পা রাখতেই সবার ভেতরকার লুক্কায়িত কৈশোর যেন আড়মোড়া দিয়ে জেগে ওঠে। শুরু হয় জিম সদস্যদের মধ্যে ফুটবল লড়াই।

নিয়মিত শরীরচর্চা করা এই ফিটনেস উৎসাহীরা জিমে নিজেদের যে স্ট্যামিনা ও শক্তির প্রমাণ দেন, মাঠেও তার বিন্দুমাত্র কমতি ছিল না। দুটি দলে ভাগ হয়ে শুরু হওয়া এই খেলায় ছিল না কোনো পেশাদার রেফারি, ছিল না কড়া নিয়মকানুনের চোখরাঙানি; ছিল কেবল নির্ভেজাল আনন্দ আর সুস্থ প্রতিযোগিতার স্পৃহা।

বালুতে পা হড়কে পড়ে যাওয়া, দুর্দান্ত গোল করার পর বুনো উল্লাসে মেতে ওঠা, আর প্রতিপক্ষকে নিয়ে মজার সব টিপ্পনী সব মিলিয়ে পুরো চরজুড়ে তৈরি হয় এক উৎসবের আবহ। যারা খেলছিলেন না, তারাও একপাশে দাঁড়িয়ে করতালি ও চিৎকারের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিচ্ছিলেন।

খেলা শেষে জয়-পরাজয়ের হিসাব ছাপিয়ে একে অপরকে বুকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটিই প্রমাণ করে দেয় প্রতিযোগিতার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার মাঝেই।

খেলাধুলা আর বাঁধনহারা ছোটাছুটির পর সবার পেটে তখন প্রচণ্ড ক্ষুধা। সেই ক্ষুধা নিবারণে নৌকায় ছিল এলাহি সব খাবারের রাজকীয় আয়োজন। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুরের ভারী আহার সবকিছুতেই ছিল পরম যত্ন আর স্বাদের ছোঁয়া।

দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পদের পাশাপাশি ফিটনেস-সচেতন সদস্যদের জন্য ছিল স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের বিশেষ ব্যবস্থা, যা আয়োজকদের দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতারই প্রমাণ দেয়।

তবে এই ভোজনপর্ব কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম ছিল না। খোলা আকাশের নিচে, নদীর তাজা বাতাসে বসে সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়ার এই পর্বটি ছিল দারুণ আবেগময়। একে অপরের প্লেটে খাবার তুলে দেওয়া, গোল হয়ে বসে আড্ডা দেওয়া এসব ছোট ছোট মুহূর্তই জিমের সহকর্মীদের এক নিমেষে যেন পরিবারের সদস্যে পরিণত করে।

ব্যস্ত জীবনে আমরা হয়তো একসঙ্গে খাওয়ার সময়টুকুও পাই না; সেখানে প্রকৃতির কোলে বসে এমন সম্মিলিত আহার সবার হৃদয়ে এক গভীর আত্মিক বন্ধন তৈরি করে দেয়।

খাওয়াদাওয়া শেষে দুপুরের অলস রোদে নৌকার ডেকে শুরু হয় বিনোদনের মূল পর্ব। গোল হয়ে বসে গানে গানে মুখর হয়ে ওঠেন সবাই। কেউ হয়তো পেশাদার গায়ক নন, কিন্তু খোলা গলায় গাওয়া প্রতিটি গানেই ছিল প্রাণের গভীর আবেগ।

পুরোনো দিনের নস্টালজিক গান থেকে শুরু করে হালের জনপ্রিয় আধুনিক গান সব সুরই যেন নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করছিল। কেউ গিটারে সুর তুলছিলেন, কেউবা আবার হাতের কাছে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়েই তাল বাজাচ্ছিলেন।

গানের ফাঁকে ফাঁকে চলতে থাকে প্রাণখোলা আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা আর জোকসের আসর। কেউ নিজের জীবনের মজার কোনো ঘটনা শেয়ার করছিলেন, কেউবা বলছিলেন ফিটনেস জার্নির শুরুর দিকের সংগ্রামের গল্প।

এই আড্ডায় কোনো বয়সের ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না পেশাগত বা সামাজিক মর্যাদার কোনো দেয়াল। তরুণ থেকে প্রবীণ সবাই একই সমতলে বসে মেতে উঠেছিলেন জীবনের উদযাপনে। মোবাইল স্ক্রিনের কৃত্রিম দুনিয়া থেকে বেরিয়ে এসে মানুষে মানুষে এই যে সরাসরি সংযোগ, এটাই যেন ছিল এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

এই পুরো আয়োজনের মধ্যমণি ছিলেন ওয়ান জিমের কর্ণধার হোসাইন মেহেদী। একজন সাধারণ ব্যবসায়ীর খোলস ছেড়ে তিনি এদিন হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় অভিভাবক ও বন্ধু। তিনি কেবল এই ট্রিপের আয়োজক বা ব্যবস্থাপকই ছিলেন না, বরং দিনব্যাপী প্রতিটি কার্যক্রমে নিজে সশরীরে উপস্থিত থেকে সবার আনন্দকে দ্বিগুণ করেছেন।

ফিটনেস ইন্ডাস্ট্রিতে যখন কেবল সদস্য সংখ্যা বাড়ানো বা ব্যবসায়িক লাভের প্রতিযোগিতা চলে, সেখানে হোসাইন মেহেদী বেছে নিয়েছেন ভিন্ন এক মানবিক পথ। তিনি প্রমাণ করেছেন, একটি ফিটনেস সেন্টার কেবল লোহা-লক্কড় আর যন্ত্রপাতির সমাহার নয়; এটি একটি সম্প্রদায়, একটি পরিবার।

যেখানে ঘামের পাশাপাশি মানুষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাও শেয়ার করে। সদস্যদের মানসিক প্রশান্তির কথা ভেবে তার এই উদ্যোগ জিমের সদস্যদের কাছে তাকে আরও বেশি সম্মানিত ও আপন করে তুলেছে।

সদস্যদের উচ্ছ্বাস ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশা: নৌ-ভ্রমণ শেষে সদস্যদের মুখে ছিল তৃপ্তির ছাপ। অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন পর এমন একটি আয়োজন তাদের দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি দূর করেছে। কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে আনন্দ পেয়েছেন, কেউ ফুটবল খেলায়, কেউবা গান-আড্ডা ও খাবারের আয়োজনে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন।

সদস্যদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতেও ওয়ান জিম কর্তৃপক্ষ এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত রাখবে। নৌ-ভ্রমণের পাশাপাশি পাহাড়, সমুদ্রসৈকত, গ্রামীণ পরিবেশ কিংবা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও দলগত ভ্রমণের আয়োজন করা যেতে পারে এমন মতও প্রকাশ করেন অনেকে।

তাদের মতে, এসব আয়োজন শুধু বিনোদনের সুযোগ তৈরি করে না; বরং জিমের সদস্যদের মধ্যে পরিচিতি বাড়ায়, বন্ধুত্ব গড়ে তোলে এবং সবাইকে একটি বৃহত্তর পরিবারের অংশ হিসেবে অনুভব করায়।

দিনের শেষে এক বুক প্রশান্তি: দিন গড়িয়ে বিকেল নামে। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে নদীর বুকে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিচ্ছিল, নৌকার মুখ তখন বাড়ির দিকে। সারাদিনের বাঁধভাঙা আনন্দ, খেলাধুলা, গান, আড্ডা ও ভোজন শেষে সবার চোখেমুখেই ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তির আভা। ফেরার পথে অনেকেই মুঠোফোনে বন্দি করা ছবিগুলো দেখছিলেন আর ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন।

১৪ আগস্টের এই নৌ-ভ্রমণটি ওয়ান জিমের সদস্যদের জন্য কেবল একটি দিনের আউটিং হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে শরীর ও মনকে নতুন করে রিফ্রেশ করার এক অসাধারণ থেরাপি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি থেকে সাময়িক মুক্তি পেয়ে জিমের সদস্যরা ফিরে গেছেন এক নতুন উদ্যম আর জীবনীশক্তি নিয়ে।

নদীর বুকে কাটানো এই একটি দিনের স্মৃতি তাদের মনে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে এবং আগামী দিনের ফিটনেস জার্নিতে জোগাবে নতুন প্রেরণা। ওয়ান জিম প্রমাণ করে দিল শরীরচর্চার পাশাপাশি মানুষের মনের যত্ন নিতে পারলেই গড়ে ওঠে সত্যিকারের এক সুস্থ ও সুন্দর জীবন। 

ছবি দিয়ে যারা সহযোগিতা করেছেন: লুৎফর, নাহিদ, আকাশ, ফায়েজ, আরমান।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!