ঢাকা মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

জিম্মি করে ভিডিও বার্তা ও ছাত্রসমাজের প্রত্যাখ্যান: ফিরে দেখা ২৮ জুলাই

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৮, ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

জিম্মি করে ভিডিও বার্তা ও ছাত্রসমাজের প্রত্যাখ্যান: ফিরে দেখা ২৮ জুলাই

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে আটকে রেখে জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা আদায় এবং সেটি প্রত্যাখ্যান করে দেশজুড়ে ছাত্রসমাজের ফুঁসে ওঠার এক ঐতিহাসিক দিন ছিল ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই।

এদিন রাতে ডিবি কার্যালয় থেকে একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়, যেখানে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে সব ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে দেখা যায়। এর আগে ভোররাতে পাঁচ সমন্বয়কের পর আরেক সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুমকেও তুলে নিয়ে যায় ডিবি।

সরকারের পক্ষ থেকে তখন দাবি করা হয়েছিল, ‘নিরাপত্তার স্বার্থেই’ তাদের গোয়েন্দা হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে এই ভিডিও বার্তার পরপরই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ করেন যে, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সমন্বয়কদের কাছ থেকে এই জোরপূর্বক বক্তব্য আদায় করা হয়েছে।

পরবর্তীতে মুক্ত হয়ে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ডিবি হেফাজতে তাদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

সাবেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার জানান, ডিবি কার্যালয়ে তাদের হাত ও চোখ বেঁধে চার ঘণ্টা পর্যন্ত ঝুলিয়ে রেখে নির্মম মারধর করা হয়েছিল।

আরেক সাবেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জানান, যেকোনো মূল্যে আন্দোলন স্থগিত করার লক্ষ্যে ডিবি তাদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপ প্রয়োগ করে ওই ভিডিও বার্তাটি তৈরি করেছিল এবং সেটি যে গণমাধ্যমে প্রচার করা হবে, তা তারা ঘুণাক্ষরেও জানতেন না।

সমন্বয়কদের এই জোরপূর্বক বার্তার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তা কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেন। শীর্ষ ছয় সমন্বয়ক ডিবি হেফাজতে থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলনের হাল ধরেন অন্য সমন্বয়কেরা।

সেদিন সব অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে ঢাকার আটটি স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেন সমন্বয়ক আব্দুল কাদের।

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান জানান, সরকারের এ ধরনের কূটকৌশলের বিষয়ে তারা আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। শীর্ষ নেতৃত্ব গ্রেপ্তার হলেও পরবর্তী স্তরের নেতৃত্ব প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, কারণ আন্দোলন তখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখান থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট ছিল না।

একদিকে যখন রাজপথে শিক্ষার্থীদের ওপর ধরপাকড় ও নির্যাতন চলছিল, অন্যদিকে তখন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল আন্দোলন ঘিরে সংঘাতে ১৪৭ জন নিহত হওয়ার সরকারি তথ্য প্রকাশ করেন।

একই দিনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বাবাসহ নিহত ব্যক্তিদের ৩৪টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। এরপর তিনি রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল এবং বিএসএমইউ-তে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান।

সরকারের এসব কর্মসূচির আড়ালে দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেপরোয়া গ্রেপ্তার অভিযান ঠিকই অব্যাহত ছিল। ১৬ থেকে ২৮ জুলাই এই ১২ দিনে ঢাকাসহ ১৮টি জেলায় অন্তত ২৫৩ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে এত দমন-পীড়ন ও কূটকৌশলও ছাত্র-জনতার ক্ষোভকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি।

চূড়ান্ত গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সেই ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাই ডিবি কার্যালয়ের বাইরের দেয়ালে তীব্র ব্যঙ্গ করে লিখে দিয়ে আসে ‘হারুনের ভাতের হোটেল’, যা আজ স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতনের এক প্রতীকী স্মারক হয়ে আছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!