ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News
পাচারের অর্থ ফেরাতে মরিয়া ঢাকা

সাইপ্রাসে এস আলমের বাড়ি জব্দ, আন্তর্জাতিক আদালতে পাল্টা মামলা

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম

সাইপ্রাসে এস আলমের বাড়ি জব্দ, আন্তর্জাতিক আদালতে পাল্টা মামলা

বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আইনি অগ্রগতির মুখ দেখেছে বাংলাদেশ। ব্যাংক জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অংকের অর্থ পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের মালিকানাধীন ভূ-মধ্যসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোশিয়ার একটি বিলাসবহুল বাড়ি জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় আদালত। বাংলাদেশ সরকারের সুনির্দিষ্ট অনুরোধের প্রেক্ষিতে নিকোশিয়া জেলা আদালত এই সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেন বলে সাইপ্রাসের স্থানীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এই অর্থ পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখা ‍‍`বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট‍‍` (বিএফআইইউ)-এর দীর্ঘ দেড় বছরের অনুসন্ধানে অর্থ পাচারের গন্তব্য হিসেবে এ পর্যন্ত দেড় ডজনেরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের নাম উঠে এসেছে। এই তালিকায় রয়েছে- যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাইপ্রাস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, ভারত, লুক্সেমবার্গ, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, আইল অব ম্যান, জার্সি, গার্নসি এবং সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস।

এসব দেশের প্রশাসনের কাছে সম্পদ জব্দের অনুরোধ জানানোর পর ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য, সাইপ্রাস এবং যুক্তরাজ্যের স্বশাসিত অঞ্চল আইল অব ম্যানে অভিযুক্তদের কিছু সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “তিনটি দেশে ইতিমধ্যে সম্পদ জব্দ হয়েছে। বাকি দেশগুলোর ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া ও প্রসিডিউর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অন্য একটি দেশের অনুরোধ পেলেই তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবে না, এটাই স্বাভাবিক। তবে প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।”

পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের প্রথম ধাপে দেশের শীর্ষ ছয়টি ব্যবসায়ী ও শিল্প গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করেছে বিশেষ টাস্কফোর্স। এই তালিকায় সবার ওপর রয়েছে এস আলম গ্রুপের সাইফুল আলম চৌধুরী এবং ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ। এর বাইরে বেক্সিমকো গ্রুপ (সালমান এফ রহমান পরিবার), সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ এবং ওরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধেও মামলা সচল করা হয়েছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এই মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

পাচারের অর্থ প্রমাণ করে ভিনদেশের আদালত থেকে তা দেশে ফিরিয়ে আনা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, পাচার হওয়া অর্থের মাত্র ১ শতাংশ দেশে ফেরত আসে, যার জন্য গড়ে ৭ থেকে ২০ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। তাছাড়া আন্তর্জাতিক আদালতে বছরের পর বছর মামলা চালানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল।”

এই ব্যয় ও আইনি সংকট মোকাবিলায় অভিনব কৌশল নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুনামধন্য ৯টি আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে চুক্তি সই করা হয়েছে। অর্থাৎ, এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করে বাংলাদেশে ফেরত আনতে পারে, কেবল তখনই তারা উদ্ধার হওয়া অর্থ থেকে নির্দিষ্ট ফি পাবে। এর ফলে সরকারকে বা ব্যাংকগুলোকে এখনই কোনো নগদ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, “পাচার হওয়া অর্থ অন্য দেশে ঢুকেছে বৈধ বিনিয়োগ হিসেবে, তাও আবার তৃতীয় কোনো দেশ হয়ে। ফলে আন্তর্জাতিক আদালতে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করা বেশ কষ্টসাধ্য হবে।”

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আইনি ভিন্নতা দূর করতে শীর্ষ ১০টি দেশের কাছে দ্বিপাক্ষিক আইনি সহায়তা চুক্তির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং হংকং ইতিবাচক সাড়া দিলেও পশ্চিমা দেশগুলো একক চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি। কারণ, বাংলাদেশের দৃষ্টিতে এই অর্থ অবৈধ হলেও, বিনিয়োগ হিসেবে নেওয়ায় ওইসব দেশের আইনে তা বৈধ। তাই শুধু আইনি লড়াই নয়, এখানে শক্তিশালী কূটনীতিও প্রয়োজন।

এদিকে অর্থ পাচার ও সম্পদ জব্দের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে অস্বীকার করেছে এস আলম ও বেক্সিমকো গ্রুপ। উল্টো দেশে-বিদেশে নিজেদের সম্পদ জব্দের প্রতিবাদে এবং তা সুরক্ষার উদ্দেশ্যে ওয়াশিংটনে অবস্থিত বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে একটি পাল্টা মামলা দায়ের করেছেন সাইফুল আলম, যার আইনি কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, “এটি মূলত দেশের জনগণের অর্থ। যেহেতু আমরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার, তাই জনগণের অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে তা দেশের কল্যাণে ব্যয় করা আমাদের সর্বোচ্চ দায়িত্ব ও অগ্রাধিকার। যে পদক্ষেপ নিলে এই টাকা ফেরত আসবে, সরকার সেই পদক্ষেপই গ্রহণ করবে।”

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও জানান, পাচারকৃত টাকা যেখানেই শনাক্ত করা যাবে, কূটনৈতিক ও আইনি চ্যানেলে তা ফেরত আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চ্যালেঞ্জ যতই থাকুক না কেন, অন্তত একটি মেগা মামলাতেও যদি জয়লাভ করে পাচারের অর্থ দেশে ফেরত আনা যায়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অপরাধ দমনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!