দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় এক বড় আমূল পরিবর্তন এসেছে। পহেলা জুলাই থেকে দেশের সমস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট পয়েন্টে পুরনো সব কিউআর কোড সরিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে শুধু `বাংলা কিউআর` প্রদর্শন করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থনীতিকে দ্রুত `ক্যাশলেস` বা নগদ অর্থহীন করার এবং ডিজিটাল পেমেন্টকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করার লক্ষ্যেই এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে এখন থেকে গ্রাহকদের বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস যেমন- বিকাশ, নগদ, রকেট) বা আলাদা আলাদা ব্যাংকের জন্য আলাদা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। দোকানে ঝুলানো একটিমাত্র সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ কোড স্ক্যান করেই যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই পেমেন্ট সম্পন্ন করা যাবে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের আর দামি পিওএস মেশিন বা কাউন্টারে একাধিক কিউআর স্ট্যান্ড রাখার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
তবে এই নতুন নিয়ম চালুর পর থেকেই লেনদেন প্রক্রিয়া, লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ফি নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে বাজারে নানা আলোচনা ও অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে।
ডিজিটাল লেনদেন সচল রাখতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ রয়েছে, যাকে কারিগরি ভাষায় `মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট` বা এমডিআর বলা হয়। ২০২৪ সালে যখন এই প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তখন ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের কথা চিন্তা করে এই ফি-এর একটি সর্বোচ্চ সীমা (কার্ডে ০.৫০% এবং এমএফএসে ০.৮০%) নির্ধারণের কথা ছিল।
তবে পহেলা জুলাইয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে সর্বনিম্ন ‘১ শতাংশ’ এমডিআর ফি বেঁধে দিয়েছে। অর্থাৎ, কিউআর কোডে প্রতি ১ হাজার টাকা লেনদেন হলে ব্যবসায়ীকে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ন্যূনতম ১০ টাকা চার্জ দিতে হবে।
এই ফি নিয়ে সাধারণ গ্রাহক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করে জানিয়েছে এই ১ শতাংশ ফি সম্পূর্ণভাবে ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর মধ্যকার বিষয়। কোনো অবস্থাতেই গ্রাহকের পকেট থেকে এই বাড়তি টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। এর দায় মার্চেন্ট বা বিক্রেতাকেই বহন করতে হবে।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছুটা নমনীয়তার সুযোগও রেখেছে। কোনো ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠান যদি তাদের প্রচারণা বা বিশেষ অফারের অংশ হিসেবে এই চার্জ নিজেরা বহন করতে চায় বা মার্চেন্টকে ছাড় দিতে চায়, তবে তারা তা করতে পারবে।
অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট জনপ্রিয় করার শুরুতেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর এমন ১ শতাংশের স্থায়ী চার্জ বসালে মাঠপর্যায়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক ছোট ব্যবসায়ী ইতিমধ্যেই ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের পেমেন্টে ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়তি টাকা দাবি করেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এখন বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও অনেক বিক্রেতা পণ্যের দাম বাড়িয়ে ক্রেতার ওপর এই ব্যয়ের দায় চাপিয়ে দিতে পারেন কিংবা ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে অনীহা প্রকাশ করতে পারেন।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “শুরুতেই এটিকে সরকারের রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে সর্বস্তরে ডিজিটাল লেনদেনের অন্তর্ভুক্তিকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এই এমডিআর ফি ১ শতাংশের জায়গায় প্রাথমিকভাবে ০.৫ শতাংশ করা যেতে পারে, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আকৃষ্ট হন।”
তবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব মানুষের অভ্যাস পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়ে ইতিবাচক যুক্তি দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, “এক সময় মনে হতো ক্রেডিট কার্ডের কস্ট এতো বেশি যে কেউ ব্যবহার করবে না, ব্যবসায়ীরাও নিতে চাইত না। কিন্তু এখন ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট করলে উল্টো ডিসকাউন্ট দেওয়া হচ্ছে। মানুষের অভ্যাস বদলে কিছুটা সময় লাগবে। তাছাড়া ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এটি বেশি নিরাপদ; দোকান থেকে রাতে বাড়ি ফেরার সময় ক্যাশ টাকা ছিনতাই হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না। আর ১০ হাজার টাকার ১ শতাংশ যত বড় মনে হয়, ২০ বা ৫০ টাকার খুচরা কেনাকাটায় ১ শতাংশ কিন্তু গায়েই লাগবে না।”
কাগজে-কলমে এই সর্বজনীন কিউআর কোড ব্যবস্থা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হলেও মাঠপর্যায়ে বেশ কিছু বাস্তবমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. ইন্টারনেট ও সাইবার নিরাপত্তা: গ্রামে বা মফস্বলে সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ এবং সাইবার জালিয়াতি রোধ করা বড় চ্যালেঞ্জ।
২. ক্যাশ-আউট জটিলতা: বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতা হেলাল উদ্দিন বলেন, “ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বড় সমস্যা হলো— কিউআরের মাধ্যমে ডিজিটাল টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হলেও তা প্রতিদিন ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ‘ক্যাশ’ বা নগদ করার প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল।”
৩. করের ভয়: লেনদেনের সমস্ত তথ্য নথিবদ্ধ বা ডকুমেন্টেড হয়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মনে একটি প্রচ্ছন্ন ভয় কাজ করছে যে, পরবর্তীতে এর ওপর ভিত্তি করে বড় করের (Tax) বোঝা চাপানো হতে পারে।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে নিয়মিত লেনদেন করার ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি ‘ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল প্রোফাইল’ তৈরি হবে। এর ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের কোনো জামানত ছাড়াই সহজ শর্তে ঋণ দিতে উৎসাহিত হবে।
সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ক্যাশলেস করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ভবিষ্যতে সমস্ত সরকারি সেবা ও ইন্টারনেট ছাড়া অফলাইনেও কিউআর লেনদেনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে কিছু জটিলতা থাকলেও অর্থ পাচার রোধ ও দেশের অর্থনীতিকে স্বচ্ছ করতে এই নজির স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।


আপনার মতামত লিখুন :