ফিফা র্যাংকিংয়ের ৬৭ নম্বরে থাকা দল, জনসংখ্যার বিচারেও টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ছোট দেশ অথচ ফুটবল বিশ্বমঞ্চে তারা যে ছাপ রেখে গেল, তা রূপকথাকেও হার মানায়। লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা আর্লিং হালান্ডদের মহাতারকা দ্যুতিকে একপাশে ঠেলে দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়া দেশ ‘কেপ ভার্দে’।
পরাশক্তি স্পেনের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট অর্জন, উরুগুয়ের জালে প্রথম গোল কিংবা আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন ঘটানোর দোড়গোড়ায় পৌঁছে যাওয়া ব্লু শার্কসদের এই বিশ্বকাপ যাত্রায় নাটকীয়তার কোনো কমতি ছিল না।
মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ের শেষ বাঁশি বাজতেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হেরে মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েন কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। টাইব্রেকারে যাওয়ার মাত্র ১০ মিনিট আগে ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেড ডিফেন্ডার ডিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করে জালে জড়ালে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হয়। তবে ম্যাচ হারলেও অপরাজিত বীরের মতো মাথা উঁচু করেই মাঠ ছেড়েছে কেপ ভার্দে।
বিবিসি রেডিও ৫ লাইভে স্কটল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার জেমস ম্যাকফ্যাডেন বলেন, "কেপ ভার্দে আজ হেরেও জয়ী হয়েছে। তারা যে সাহস, একতা এবং নিজেদের সামর্থ্যের প্রতি অটল বিশ্বাস দেখিয়েছে, তা-ই মূলত এই বিশ্বকাপের আসল গল্প।"
গ্রুপ পর্বে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দেওয়াসহ টানা তিনটি ড্র করে নকআউট পর্বে এসেছিল তারা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমে মেসির গোলে পিছিয়ে পড়েও সমতায় ফেরা এবং অতিরিক্ত সময়ে সিডনি লোপেস কাবরালের দুর্দান্ত ভলিতে দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের স্তব্ধ করে সমতা ফেরানো ছিল জাদুকরী। ইংল্যান্ডের সাবেক কিংবদন্তি রাইট-ব্যাক গ্যারি নেভিল বলেন, “এটি ছিল ফুটবল ইতিহাসে আন্ডারডগ কোনো দলের কাছ থেকে দেখা অন্যতম সেরা ও মহান পারফরম্যান্স।”
হৃদয়ভাঙা বিদায়ের পরও দলের ফুটবলারদের নিয়ে গর্বে ভাসছেন কেপ ভার্দের প্রধান কোচ বুবিস্তা। তিনি বলেন, “আমরা প্রমাণ করেছি যে আমরা ছোট দেশ হতে পারি, কিন্তু বিশ্বের যেকোনো সেরা দলের বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়াই করতে পারি।”
দলের তারকা সেন্টার-ব্যাক রবার্তো ‘পিকো’ লোপেস আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “এই বিশ্বকাপ থেকে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো- এখন আর বিশ্বের কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করে না যে মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায় আছে! আমরা নিজেদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি।”
৪৮ দলের বর্ধিত বিশ্বকাপ নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যারা সমালোচনা করেছিলেন, কেপ ভার্দের এই পারফরম্যান্স তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট বলেন, “ফিফার উচিত ফুটবলের এই অর্থ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে কেপ ভার্দের মতো ছোট ছোট দেশগুলোও বিশ্বমঞ্চে এসে বড়দের সাথে লড়াই করার সুযোগ পায়।”
কেপ ভার্দের এই অবিশ্বাস্য রূপকথার নেপথ্য নায়ক হলেন তাদের ৪১ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের পর বিশ্বমঞ্চে কেপ ভার্দের পতাকা হাতে তাঁর অশ্রুসিক্ত ছবি সারা বিশ্বের ফুটবল প্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
লন্ডন বা মাদ্রিদের নামী ক্লাব নয়, পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল ‘শাভেস’-এর সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ভোজিনিয়া বর্তমানে সম্পূর্ণ ‘ক্লাবহীন’ একজন গোলরক্ষক। অথচ বিশ্বকাপের এই আসরে মায়ামির ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একাই ৮টি সেভসহ টুর্নামেন্টে মোট ১৮টি চোখধাঁধানো সেভ করেছেন তিনি। গ্যারি নেভিল বলেন, “এই বিশ্বকাপের পর ভোজিনিয়াকে আর বেশিদিন ক্লাবহীন থাকতে হবে না, তিনি দুর্দান্ত কোনো ক্লাবের প্রস্তাব পেতে যাচ্ছেন।”
কেপ ভার্দে হয়তো ট্রফি নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছে না, কিন্তু ফুটবল বিশ্বকে তারা শিখিয়ে দিয়ে গেল— বুকে অদম্য বিশ্বাস আর বড় একটা হৃদয় থাকলে বিশ্বমঞ্চের যেকোনো পরাশক্তিকে কাঁপিয়ে দেওয়া সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :