ঢাকা শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ৩০ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

জ্বালানি সংকট ও বর্তমান বিশ্ব: আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মার্চ ৮, ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম

জ্বালানি সংকট ও বর্তমান বিশ্ব: আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু?

সকাল হতেই রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড কিংবা দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষমাণ মানুষের চোখেমুখে যে উৎকণ্ঠা, তা কেবল একটি তেলের সংকটের প্রতিচ্ছবি নয়; বরং এটি একটি আসন্ন বৈশ্বিক অস্থিরতার অশনিসংকেত। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমি ছাড়িয়ে এখন আমাদের ঢাকার রাজপথ কিংবা গাজীপুরের মহাসড়কগুলোতেও অনুভূত হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরে চলা ‘প্যানিক বায়িং’ এবং আজ থেকে কার্যকর হওয়া জ্বালানি তেলের ‘রেশনিং’ পদ্ধতি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, আধুনিক সভ্যতা কতটা ভঙ্গুর এবং জ্বালানির ওপর কতটা নির্ভরশীল।

বিশ্বের মানচিত্রে হরমুজ প্রণালি মাত্র ২১ মাইল চওড়া একটি জলপথ হলেও, এটি বিশ্ব অর্থনীতির মূল ধমনী। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান যখন এই পথে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয় কিংবা ড্রোন হামলা চালায়, তখন তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর। কারণ, আমাদের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা মানেই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং দাম আকাশচুম্বী হওয়া।

সংকট যতটা না বাস্তব, তার চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে ‘মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক’। গত দুদিনে মানুষ যেভাবে ড্রাম ভরে তেল মজুদ করার চেষ্টা করেছে, তাকে ‘প্যানিক বায়িং’ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। এই প্রবণতা তেলের সরবরাহ চেইনকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছে। যার ফলে আজ রাজধানী ও তার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর পাম্পগুলো শূন্য হয়ে পড়েছে। সরকার যে ‘রেশনিং’ পদ্ধতি চালু করেছে, তা এই মুহূর্তে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সঠিক নজরদারি ও রসিদ প্রথার স্বচ্ছতার ওপর।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিপিসি যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তাতে মোটরসাইকেলে ২ লিটার বা ব্যক্তিগত গাড়িতে ১০ লিটারের যে সীমা দেওয়া হয়েছে, তা সাময়িকভাবে যাতায়াতে ব্যাঘাত ঘটালেও বৃহত্তর সংকটের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই রেশনিং কতদিন? যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে কেবল রেশনিং দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং ‘বাফার স্টক’ বা আপদকালীন মজুত বাড়ানোর দিকে এখনই কঠোর নজর দিতে হবে।

দেশের ভেতরে যখন তেলের জন্য হাহাকার, তখন সীমান্তে পাচারের শঙ্কা একটি নতুন উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে অসাধু চক্র দেশের সস্তা তেল ওপারেই পাচারের চেষ্টা করে। চুয়াডাঙ্গা সীমান্তে বিজিবির বর্তমান তৎপরতা প্রশংসনীয় হলেও, দেশের প্রতিটি সীমান্তে এই নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। জাতীয় সম্পদ যেন কোনোভাবেই পাচার না হয়, তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের বুঝতে হবে, এটি কেবল তেলের সংকট নয়, এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এই মুহূর্তে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ি বের না করা, গণপরিবহন ব্যবহার এবং সাশ্রয়ী হওয়া এখন কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। অন্যদিকে, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন কৃষি এবং জরুরি পণ্যবাহী পরিবহন এই রেশনিংয়ের কবলে পড়ে থমকে না যায়। কারণ তেলের অভাব যদি খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলে, তবে মুদ্রাস্ফীতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

পরিশেষে, বর্তমান এই অস্থির সময়ে গুজব ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি না করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ধৈর্য ধারণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর আমাদের হাত নেই সত্য, কিন্তু আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী মনোভাবই পারে এই কঠিন সময় পাড়ি দেওয়ার সাহস জোগাতে।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!