ঢাকা শুক্রবার, ০১ মে, ২০২৬, ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩
Daily Global News

মে দিবস: যে রক্তে লেখা অধিকার, তা ভুলে গেলে চলে না

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ১, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম

মে দিবস: যে রক্তে লেখা অধিকার, তা ভুলে গেলে চলে না

সকাল সাতটা। রিকশাওয়ালা করিম সাহেব প্যাডেল মারছেন। ঘাম ঝরছে। কিন্তু থামার সময় নেই। কারণ তার মেয়ের স্কুলের বেতন বাকি। দুপুর বারোটা।

গার্মেন্টস শ্রমিক সালমা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন মেশিনের সামনে। টানা আট ঘণ্টা। পা ফুলে গেছে। কিন্তু বসার অনুমতি নেই। কারণ "টার্গেট" বাকি।

রাত দশটা। নির্মাণ শ্রমিক রহিম মিয়া ফিরছেন সাইট থেকে। সারাদিন ইট বয়েছেন, রড বেঁধেছেন। কিন্তু হাতে মাত্র পাঁচশ টাকা। কারণ "ওভারটাইম" বলে কিছু নেই তার জীবনে।

এই করিম, সালমা আর রহিম এরাই বাংলাদেশের মেরুদণ্ড। এরাই গড়ে তুলছে এই দেশ। কিন্তু ১ মে এলেই আমরা বলি "শ্রমিক দিবস।" একদিনের জন্য মনে পড়ে, তারপর ভুলে যাই। কিন্তু মে দিবস শুধু একটা ছুটির দিন নয়। এটা একটা রক্তে লেখা ইতিহাস।

শিকাগোর রক্তাক্ত রাস্তা যেখান থেকে শুরু:

১৮৮৬ সাল। আমেরিকার শিকাগো শহর। সেই সময় শ্রমিকদের কাজ করতে হতো দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা। কোনো ছুটি নেই, কোনো বিশ্রাম নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই। মেশিনে হাত চলে গেলে? চাকরি চলে যায়। অসুস্থ হলে? রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। শ্রমিকরা দাবি তুলল "আমরা দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করবো।"

কী সহজ একটা দাবি, তাই না? ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম, ৮ ঘণ্টা পরিবারের সাথে। কিন্তু মালিকরা রাজি হলো না। কারণ তাদের কাছে শ্রমিক মানে "যন্ত্র" মানুষ নয়।

১ মে, ১৮৮৬। শিকাগোর হে মার্কেটে জড়ো হলো লাখো শ্রমিক। শান্তিপূর্ণ মিছিল। হাতে প্ল্যাকার্ড "৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার চাই।"

পুলিশ গুলি চালালো। রক্তে ভেসে গেল রাস্তা। মারা গেল অসংখ্য শ্রমিক। কিন্তু তাদের চিৎকার থেমে গেল না। ৪ মে আবার জড়ো হলো তারা। আবার গুলি। আবার মৃত্যু। আবার রক্ত।

কিন্তু সেই রক্তই জিতে গেল শেষপর্যন্ত। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মেকে ঘোষণা করা হলো- আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। হে মার্কেটের সেই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে পৃথিবীর শ্রমিকরা পেয়েছিল ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার।

বাংলাদেশে মে দিবস- লড়াই এখনো শেষ হয়নি:

১৩৮ বছর পরেও বাংলাদেশে করিম সাহেব রিকশা চালাচ্ছেন সকাল সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। সালমা বেগম দাঁড়িয়ে আছেন মেশিনের সামনে ১০-১২ ঘণ্টা। রহিম মিয়া ইট বয়ছেন ১৪ ঘণ্টা।

৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার? এখনো স্বপ্নই থেকে গেছে অনেকের জন্য। বাংলাদেশে শ্রম আইন আছে। কাগজে কলমে সুন্দর। কিন্তু বাস্তবে?

গার্মেন্টস শ্রমিকদের টানা ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়, অনেক সময় ওভারটাইমের টাকাও মেলে না। রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক তাদের কোনো চুক্তিপত্র নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই।

কারখানায় আগুন লাগলে, ভবন ধসে পড়লে মরে যায় শ্রমিক। কিন্তু বিচার? রানা প্লাজা ধসে ১১৩৬ জন মরেছিল ১৩ বছর আগে। আজও বিচার শেষ হয়নি।

তাহলে মে দিবসের মানে কী?

মে দিবস মানে শুধু একদিনের ছুটি নয়, মে দিবস এলে আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই "শ্রমিক ভাইদের প্রতি শ্রদ্ধা।" মিছিল হয়, বক্তৃতা হয়, ছবি তোলা হয়। কিন্তু পরদিন? পরদিন আমরা রিকশাওয়ালার সাথে দরদাম করি দশ টাকা নিয়ে। কাজের মেয়েকে বকা দিই একটু দেরি হলে। ড্রাইভারকে গালি দিই ট্রাফিক জ্যামে আটকে গেলে। মে দিবসের আসল মানে হলো- শ্রমিকদের প্রতি সম্মান। শুধু একদিন নয়, প্রতিদিন।

শ্রমিক মানে "নিচু শ্রেণি" নয় মেরুদণ্ড

একবার ভাবুন তো:

যে রাস্তা দিয়ে আপনি গাড়িতে অফিস যান, সেটা বানিয়েছে কে? নির্মাণ শ্রমিক।
যে শার্ট-প্যান্ট পরে আপনি মিটিং করেন, সেটা সেলাই করেছে কে? গার্মেন্টস শ্রমিক।
যে খাবার খেয়ে আপনি বেঁচে আছেন, সেটা ফলিয়েছে কে? কৃষক।

শ্রমিক ছাড়া এই দেশ একদিনও চলবে না। কিন্তু তাদের প্রতি আমাদের সম্মান কতটুকু?
রিকশাওয়ালাকে বলি "মিয়া।" কাজের মেয়েকে বলি "বুয়া।" নির্মাণ শ্রমিককে বলি "মিস্ত্রি।"
কিন্তু এরাই তো আমাদের দেশের আসল নায়ক।


মে দিবসের প্রতিশ্রুতি:

এই মে দিবসে আসুন আমরা কিছু প্রতিশ্রুতি করি-
১. শ্রমিকদের প্রতি সম্মান দেখাই- রিকশাওয়ালাকে "ভাই" বলুন, কাজের মেয়েকে "আপা" বলুন। তাদের সাথে সম্মানের সাথে কথা বলুন।
২. ন্যায্য মজুরি দিই, দশ টাকা বাঁচাতে গিয়ে একজন মানুষকে কষ্ট দেবেন না। যা পাওনা, তা দিন সময়মতো।
৩. নিরাপত্তার দাবি করি, কারখানায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাই, ভবন নির্মাণে সতর্কতা চাই, শ্রমিকদের জন্য বীমা চাই।
৪. শ্রম আইন বাস্তবায়ন চাই, সরকারকে চাপ দিতে হবে। শ্রম আইন যেন শুধু কাগজে না থাকে, বাস্তবেও কার্যকর হয়।
৫. বিচার চাই, রানা প্লাজার মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে। আর যদি ঘটেই যায়, তাহলে বিচার যেন ১৩ বছর ঝুলে না থাকে।


শ্রমিকের ঘামেই গড়া এই দেশ:

শিকাগোর হে মার্কেটে যেদিন গুলি চলেছিল, সেদিন একজন শ্রমিক মরার আগে বলেছিল, "আমরা আজ মরলেও, আমাদের সন্তানরা ৮ ঘণ্টা কাজ করে বাঁচবে। আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না।" তাদের রক্ত বৃথা যায়নি। পৃথিবীর কোটি কোটি শ্রমিক আজ ৮ ঘণ্টা কাজের অধিকার পেয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অনেক করিম, সালমা, রহিম যারা ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজ করছে। যাদের কোনো অধিকার নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই। মে দিবস শুধু স্মরণ নয় এটি দায়িত্বের দিন। শ্রমিকের ঘামেই গড়া এই দেশ। তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হোক আমাদের প্রতিশ্রুতি। মে দিবসের চেতনা হোক প্রতিদিনের চর্চা।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!