ভৌগোলিক অবস্থান অনেক সময় একটি জাতির জন্য আশীর্বাদ আবার কখনো বা বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে দাঁড়ায়। ইরানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। পারস্য উপসাগর আর ওমান উপসাগরের মাঝে অবস্থিত মাত্র ২১ থেকে ৩৩ মাইল প্রশস্ত এক চিলতে জলপথ হরমুজ প্রণালি। আপাতদৃষ্টিতে এটি কেবল একটি নৌপথ মনে হলেও, বর্তমানে এটি বিশ্ব অর্থনীতির নাড়ি বা ‘লাইফলাইন’ হিসেবে স্বীকৃত। আর এই চাবিকাঠিটি আজ এমন এক শক্তির হাতে, যারা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের চোখের বিষ।
কেন এটি বিশ্বের দামি পথ? পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চোখ কপালে ওঠার দশা হবে। প্রতিদিন বিশ্ববাজারে সরবরাহ হওয়া মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এই পথ দিয়েই যায়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় বড় তেল উৎপাদনকারী দেশের ট্যাংকারগুলো এই পথ ব্যবহার না করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারে না। শুধু তেল নয়, কাতার থেকে সরবরাহ হওয়া বিশ্বের সবচেয়ে বড় লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি)-র চালানগুলোও এই সরু পথটি পাড়ি দেয়। এক কথায়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া মানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের হাহাকার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতা।
ইরানের কৌশলগত অবস্থান: হরমুজ প্রণালির উত্তর উপকূলটি পুরোটাই ইরানের নিয়ন্ত্রণে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই প্রণালির ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের যে পথ রয়েছে, তার একটি বড় অংশ ইরানের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে পড়ে। ফলে ইরান চাইলেই যেকোনো সময় এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার বা নজরদারি করার আইনি ও ভৌগোলিক ক্ষমতা রাখে। তেহরান ভালো করেই জানে যে, পারমাণবিক ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্ব যদি তাদের কোণঠাসা করে, তবে তাদের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস হবে এই প্রণালি।
ইসলামাবাদ সংলাপের ব্যর্থতা ও ট্রাম্পের হুমকি: সম্প্রতি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, পারমাণবিক ইস্যুতে ইরান নমনীয় না হওয়ায় কোনো চুক্তি হয়নি। এর পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছে। ট্রাম্পের দাবি, ইরান এই পথে চলাচলকারী জাহাজ থেকে ‘অবৈধ টোল’ নিচ্ছে। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে মাইন ধ্বংস করা এবং ইরানকে ফি দেওয়া জাহাজগুলো মাঝসমুদ্রে আটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এটি মূলত এক ধরণের ‘ইকোনমিক ব্লকেড’ বা অর্থনৈতিক অবরোধ, যা ইরানকে সামরিক সংঘাতের দিকে উস্কে দিচ্ছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিও পাল্টা বার্তা দিয়েছেন যে, তারা হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনাকে এক ‘নতুন পর্যায়ে’ নিয়ে যাবে। এই নতুন পর্যায় বলতে তিনি যদি প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়াকে বুঝিয়ে থাকেন, তবে বিশ্ব এক ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মুখে পড়বে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও বাংলাদেশের উদ্বেগ: হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়লে তার উত্তাপ সরাসরি পড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে। ইতিমধ্যে তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এটি বড় উদ্বেগের কারণ। আমাদের এলএনজি ও জ্বালানি তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই আসে। যদি মার্কিন নৌবাহিনী এবং ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের মধ্যে কোনো সরাসরি সংঘর্ষ বাধে, তবে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইতিহাস সাক্ষী, এই সরু জলপথটি নিয়ে বারবার উত্তজনা ছড়িয়েছে, কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত এটি পুরোপুরি বন্ধ করার ঝুঁকি নেয়নি। কারণ, এটি বন্ধ করা মানে কেবল প্রতিপক্ষকে ঘা দেওয়া নয়, বরং নিজের পায়েও কুড়াল মারা। কিন্তু বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইরানের অনড় অবস্থান বিশ্বকে এমন এক খাদের কিনারায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই চাবিকাঠি যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের আগুনে জ্বলে ওঠে, তবে তার চড়া মূল্য দিতে হবে গোটা বিশ্বকে।
কূটনীতি যদি এই সংকটের সমাধান করতে না পারে, তবে হয়তো খুব শীঘ্রই আমরা সমুদ্রের নীল জলরাশিকে বারুদের ধোঁয়ায় অন্ধকার হতে দেখব।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :