তেরো বছর। ক্যালেন্ডারের পাতায় সময়টি খুবই ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষগুলোর জন্য এই তেরো বছর এক অনন্ত অপেক্ষা। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে শুধু একটি ভবন ভাঙেনি; ভেঙে পড়েছিল হাজারো শ্রমিকের স্বপ্ন, অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ, আর রাষ্ট্রের জবাবদিহির বিশ্বাস। সেই ভয়াবহ ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়, আহত হন আরও দুই হাজারের বেশি মানুষ।
সেদিনের সকালটি ছিল জীবিকার তাড়নায় ছুটে চলা মানুষের আরেকটি সাধারণ সকাল। কিন্তু আগের দিন ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের জোর করে কাজে ফেরানো হয়েছিল, এমন অভিযোগ ও তথ্যই রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিকে শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং অবহেলা ও লোভের নির্মম পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত করে। একটি ফাটলকে উপেক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে মানুষকে ঢুকতে বাধ্য করা এসব কোনো সাধারণ ভুল ছিল না; ছিল প্রাণঘাতী দায়হীনতার চূড়ান্ত উদাহরণ।
আজ, তেরো বছর পরও প্রশ্ন একই: বিচার কোথায়? হত্যা মামলা, দুর্নীতি, ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনসহ একাধিক মামলা হলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনো অধরা। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে মানে দীর্ঘ সময় পেরিয়েও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়েছে খুবই ধীরগতিতে।
এই দীর্ঘসূত্রতা কেবল আদালতের একটি ফাইলের গল্প নয়। এটি সেই মা’র গল্প, যিনি সন্তান হারিয়েছেন; সেই শ্রমিকের গল্প, যিনি পঙ্গু হয়ে বেঁচে আছেন; সেই পরিবারের গল্প, যারা আজও ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে। আহত অনেক শ্রমিক আজও শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়ছেন, অথচ তাদের জীবনের ক্ষতকে পূরণ করার মতো রাষ্ট্রীয় সাড়া তারা পাননি।
রানা প্লাজা আমাদের সামনে এক নির্মম সত্য উন্মোচন করে দিয়েছিল বাংলাদেশে শ্রমিকের জীবন এখনও কতটা অরক্ষিত। ভবনের ফাটল, তদারকির ব্যর্থতা, অনুমোদনের অনিয়ম, আর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি সব মিলিয়ে এটি ছিল একটি প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়। তাই রানা প্লাজার স্মরণ মানে শুধু নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; মানে ভবিষ্যতের জন্য জবাবদিহির দাবি তোলা।
ন্যায়বিচার বিলম্বিত হলে তা অনেক সময় ন্যায়বিচার অস্বীকৃতির সমান হয়ে যায়। রানা প্লাজার তেরো বছর আমাদের সেই নিষ্ঠুর বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে শুধু শরীর নয়, চাপা পড়ে আছে রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতিও যে প্রতিশ্রুতি ছিল নিরাপত্তা, বিচার আর মানবিক মর্যাদার।
আজ তাই প্রশ্ন একটাই: আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? নাকি রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের নিচেই চিরদিন চাপা পড়ে থাকবে ন্যায়বিচার?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :