বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ গত কয়েক দশকে বহুবার নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল সংসদীয় ইতিহাসে এমন এক রেখা টেনে দিল, যা সম্ভবত আগামী কয়েক দশকের রাজনীতির সমীকরণ নির্ধারণ করবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ’ জারি করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার সেই অধ্যাদেশকে ‘আইন’ হিসেবে পাস করে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞার সিলমোহর স্থায়ী করল। এই ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ভাগ্য নির্ধারণ নয়, বরং বাংলাদেশের ‘নিষিদ্ধের রাজনীতির সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে এই বিল পাসের পেছনে বারবার ‘জনমত’ এবং ‘গণহত্যার বিচার’ এই দুটি বিষয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর ভাষায়, এটি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর যে রাজনৈতিক বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের রাজনৈতিক অধিকার থাকা নিয়ে বিতর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে প্রশ্ন উঠছে এর আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে। অপরাধীর বিচার এবং পুরো একটি রাজনৈতিক সত্তার বিলুপ্তি এই দুটির মাঝে যে সূক্ষ্ম ব্যবধান, তা এই আইনের মাধ্যমে মুছে ফেলা হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অনেকে মনে করেছিলেন, নির্বাচিত হয়ে আসার পর বিএনপি হয়তো কিছুটা ‘উদারপন্থি’ অবস্থান নেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, বিএনপি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের সেই কঠোর অবস্থানকেই চিরস্থায়ী রূপ দিল। প্রবীণ আইনজীবী শাহদীন মালিকের সেই সতর্কবার্তা এখানে প্রণিধানযোগ্য এই বিল পাস করে বিএনপি নিজেই ভবিষ্যতে দল নিষিদ্ধ করার একটি ‘বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত’ তৈরি করে রাখল। রাজনীতির মাঠ যখন প্রতিপক্ষহীন হয়ে পড়ে, তখন ক্ষমতার দম্ভ বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিএনপি কি তবে আওয়ামী লীগের ফেলে আসা সেই একই পথে পা বাড়াল?
"অপরাধী ব্যক্তির বিচার যেমন জরুরি, তেমনি একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর, তা নিয়ে রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কেবল আইনি বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর রাজনৈতিক কৌশল।"
বিএনপি কেন এই ‘দায়’ কাঁধে নিল? এর পেছনে রয়েছে ত্রিমুখী সমীকরণ:
১. তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ: আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ে এখনো নিশ্চিহ্ন হয়নি। তাদের রাজনীতিতে ফিরতে দিলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতো।
২. জোটের ভারসাম্য: জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি বর্তমানে আওয়ামী লীগ ইস্যুতে অত্যন্ত কট্টর। এই মুহূর্তে তাদের বিরাগভাজন হওয়া বিএনপির জন্য আত্মঘাতী হতে পারত।
৩. প্রতিপক্ষহীন সংসদ: সংসদে শক্তিশালী কোনো বিরোধী দল না থাকা যেকোনো সরকারের জন্যই এক ধরণের ‘কমফোর্ট জোন’ তৈরি করে। বিএনপি বর্তমানে সেই সুবিধাটিই ভোগ করছে।
ইতিহাসের কী অদ্ভুত পরিহাস! ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করে সব দল নিষিদ্ধ করার জন্য বিএনপি গত ৪০ বছর ধরে আওয়ামী লীগকে ‘গণতন্ত্রের শত্রু’ বলে গালি দিয়েছে। আজ ৫২ বছর পর সেই বিএনপিই সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আইনি পূর্ণতা দিল। এটি কি প্রতিহিংসার জয় নাকি প্রকৃত ন্যায়বিচারের প্রতিফলন?
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়তো সাময়িকভাবে একটি বড় ‘রাজনৈতিক জঞ্জাল’ থেকে মুক্তি পেয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। কিন্তু প্রতিপক্ষহীন রাজনীতি প্রায়শই একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেয়। বিএনপি যদি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে এই ‘নিষিদ্ধের আইন’ যে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না তার গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না। গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত থাকে সহাবস্থানে, বর্জনে নয়। আজকের এই আইনি জয় ভবিষ্যতে বিএনপির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়ায় কি না, তা সময়ই বলে দেবে। সূত্র: বিবিসি
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :