রাত তখন প্রায় সাড়েচারটা। বিমানবন্দরের পথে গাড়িতে একজন বাবা ফোনটা কানে ধরে আছেন। ওপাশে তাঁর সাত বছরের ছেলে- ঘুম ঘুম গলায় বলছে, "আব্বু, তুমি কই?" বাবা গলা শক্ত করে বললেন, "মা`র কাছে থাকিস বাবা, ঠিকমতো পড়াশোনা করিস, আমি টাকা পাঠামু।" কিন্তু ফোনের স্ক্রিনে যে চোখ দুটো দেখা যাচ্ছিল সেখানে অঝর ধারায় পানি বইছিল। ছেলে দেখেনি। দেখলে হয়তো আর যেতে দিত না। আর সেটা জানতেন বলেই ছেলেকে ঘুমের মধ্যে রেখে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। কারণ তিনি জানেন এই বিদায়টাই তাঁর পরিবারের স্বপ্নের সূচনা। এই মানুষটার নাম কেউ জানে না। পত্রিকায় তাঁর ছবি ছাপা হয় না। কিন্তু প্রতি মাসে তাঁর পাঠানো ডলারে বাংলাদেশের রিজার্ভ ভরে ওঠে। তিনি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
রেকর্ডের পর রেকর্ড, তবু কেউ চেনে না তাদের মুখ: সংখ্যাটা দেখলে চোখ কপালে ওঠে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটেছে, দেশের স্বাধীনতার পর এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। শুধু মার্চ নয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৭ দশমিক ৮১৬ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ২০ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু এই সংখ্যার পেছনে কতটা ব্যথা, কতটা ত্যাগ সেটা কোনো পরিসংখ্যানে লেখা নেই।
সৌদি আরবের রিয়াদে ৪৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাস্তা বানাচ্ছেন কুমিল্লার রফিক। মালয়েশিয়ার কারখানায় রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করছেন নোয়াখালীর করিম। সিঙ্গাপুরের গগনচুম্বী বিল্ডিংয়ের মাচায় দাঁড়িয়ে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন সিলেটের জব্বার। এরা কেউ নায়ক নন, কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতির আসল নায়ক এরাই। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বাধলে বাংলাদেশ থেকে ৩০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়, প্রায় এক লাখ শ্রমিক সময়মতো কাজে যোগ দিতে পারেন না। যুদ্ধ তাঁদের যায় না, তবু সেই যুদ্ধের ছায়া পড়ে তাঁদের জীবনে।
ঈদে বাড়ি যেতে পারেন না, তবু ঈদ পাঠান বাড়িতে: হুন্ডি প্রতিরোধে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে পরিবারের বাড়তি কেনাকাটার জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে। ভাবুন একবার। ঈদের রাতে যখন আপনি পরিবারের সাথে সেমাই খাচ্ছেন, তখন মরুভূমির কোনো ক্যাম্পে বসে একজন বাবা ভিডিও কলে দেখছেন তাঁর সন্তানের নতুন জামা। চোখে জল, মুখে হাসি। তিনি যেতে পারেননি, কিন্তু ঈদটা পাঠিয়ে দিয়েছেন।
রিজার্ভের হিরো, কিন্তু সম্মানে শূন্য: বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে এখন ৩৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, আর এর পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রবাসী আয়। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভল্ট ভরা থাকে তাঁদের ঘামে, তবু বিমানবন্দরে ফেরার পথে কখনো কখনো তাঁদের হয়রানি সহ্য করতে হয়, দালালের খপ্পরে পড়তে হয়, পরিচয় হয় "সিম্পল মানুষ" হিসেবে। অথচ এই সিম্পল মানুষরাই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
যা পাওনা, তা কি পাচ্ছেন? প্রশ্নটা তুলতেই হয়। দেশের মোট বৈদেশিক আয়ের বিশাল অংশ আসে এই যোদ্ধাদের কাছ থেকে। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে প্রতারিত হওয়া, বেতন না পাওয়া, দুর্ঘটনায় মরে দেশে ফেরা এসব ঘটনা এখনো থামেনি। দেশে ফিরলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই, দক্ষতার স্বীকৃতি নেই। যে মানুষটি বিদেশে ১০ বছর কাটিয়ে দেশে ফিরলেন, তাঁর জন্য কি একটা সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে? উত্তরটা আমরা সবাই জানি।
বাংলাদেশকে যদি একটা বাড়ির সাথে তুলনা করি, তাহলে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা হলেন সেই মানুষ যিনি বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছেন, কিন্তু ভেতরের সবাই যেন শুকনো থাকে তার জন্য ছাদ ধরে রেখেছেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতাটুকু যেন শুধু সংখ্যার পরিসংখ্যানে না থাকে বরং তা রূপান্তরিত হোক নীতিমালায়, সম্মানে, এবং সত্যিকারের মানবিক মর্যাদায়।
রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আপনারা এই দেশের গর্ব। আপনাদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :