২০১৬ সালের ২০ মার্চ। কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাসের সুরক্ষিত বলয়ের ভেতর একটি ঝোপে পাওয়া গিয়েছিল ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর নিথর দেহ। সেইদিন আঁতকে উঠেছিল পুরো বাংলাদেশ। সেনানিবাসের মতো জায়গায় একজন নাট্যকর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকে নয়, স্তম্ভিত করেছিল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের ধারণাকে। আজ ২০২৬ সাল; ঘটনার দীর্ঘ ১০টি বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো অভিযুক্তের হাতে হাতকড়া পড়ল।
অবশেষে কাটল নিস্তব্ধতা। বুধবার (২২ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে। তনু হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর তিনিই এই মামলায় প্রথম গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি। বিকেলে কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে তোলা হলে বিচারক মো. মুমিনুল হক তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন ও মা আনোয়ারা বেগম এদিন আদালতে হাজির হয়ে রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে ছিলেন সেই কাঠগড়ার দিকে, যেখানে এক দশকের হাহাকার আজ বিচারের দাবিতে মূর্ত হয়ে উঠেছে।
তদন্তের দীর্ঘ পথে আমরা নজিরবিহীন ফরেনসিক নাটক দেখেছি। প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত ‘না পাওয়ার’ দাবি ছিল জাতির সঙ্গে এক নিষ্ঠুর তামাশা। পরে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে তনুর কাপড়ে ৩ জন পুরুষের ডিএনএ মিলেছিল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে সেই অকাট্য প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও ১০ বছরে একজন খুনিকেও শনাক্ত করার ‘সদিচ্ছা’ দেখায়নি তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থাগুলো।
গত ৬ এপ্রিল আদালতের কঠোর নির্দেশে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। পিবিআই ঢাকার পরিদর্শক ও বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম আদালতে তিনজনের ডিএনএ ম্যাচ করার আবেদন করেন। এই তিনজনই সাবেক সেনা সদস্য সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ, সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সাবেক সৈনিক শাহিদুল আলম। এর মধ্যে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সেই ‘অদৃশ্য দেয়াল’ ভাঙার প্রক্রিয়া শুরু হলো।
থানা পুলিশ থেকে ডিবি, ডিবি থেকে সিআইডি আর সর্বশেষ পিবিআই এই ১০ বছরে ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছেন। তনুর মা আনোয়ারা বেগম বারবার অভিযোগ করেছেন যে, প্রভাবশালী মহলের চাপে খুনিদের আড়াল করা হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, "সেনানিবাসের ভেতরে যেখানে একটি কাকও ঢুকতে পারে না, সেখানে আমার মেয়েকে মেরে ফেলা হলো, কিন্তু কেউ কিছু দেখল না?" বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পিবিআই-এর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, সত্যকে চিরকাল চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
তনু হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সাধারণ অপরাধ ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতার দম্ভ বনাম সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার লড়াই। ডিএনএ নমুনার মতো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থাকার পরও চার্জশিট দাখিল করতে ১০ বছর লেগে যাওয়া ‘সিস্টেমিক ফেইলর’ বা পদ্ধতিগত ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। হাফিজুর রহমানের রিমান্ডে কী তথ্য বেরিয়ে আসে, তার ওপর নির্ভর করছে বাকি দুই অভিযুক্তের ভাগ্য।
আজ তনুর মা অসুস্থ, বাবা বিচার চাইতে চাইতে জরাজীর্ণ। তাঁদের শেষ ইচ্ছা কেবল মেয়ের খুনিদের ফাঁসি দেখে যাওয়া। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে যদি প্রকৃত খুনিদের মুখোশ উন্মোচিত হয়, তবেই কলঙ্কমুক্ত হবে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা। তনুর আত্মার শান্তির জন্য, আর কোনো মায়ের বুক খালি না হওয়ার জন্য—এই বিচারের শেষ দেখা এখন সময়ের দাবি।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :