বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হয়তো এই প্রথম- সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা দাবি করলেন, "লোডশেডিং যদি করতেই হয়, তাহলে শুরু হোক সংসদ ভবন থেকেই।"
শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এই দাবির পেছনে লুকিয়ে আছে একটা বড় বাস্তবতা যখন দেশের কৃষক, শিক্ষার্থী, হাসপাতালের রোগী সবাই অন্ধকারে বসে থাকে, তখন ক্ষমতার করিডোরে বাতি জ্বলতে থাকলে মানুষ কী বুঝবে?
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, কৃষকদের সেচ কাজে সুবিধার জন্য রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট, উৎপাদন ১৪ হাজার ১২৬ মেগাওয়াট ঘাটতি প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্যখানে। বৈষম্য দূর করতে গিয়ে কি আরেক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে না?
কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আছে অনেক, কিন্তু বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে না। প্রতিমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করলেন, "বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনার ফল এটি।" একটা আমদানি করা পাওয়ার প্লান্ট আর একটা কয়লাভিত্তিক প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ। গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, সরবরাহ মাত্র ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট।
অতীতের দোষ চাপানো সহজ, কিন্তু বর্তমানের দায় এড়ানো কঠিন। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের প্রস্তাবটা তাই অস্বাভাবিক নয়। তিনি বললেন, "সংসদ ভবন যেন লোডশেডিং ম্যানেজমেন্টের বাইরে না থাকে। ঢাকার অন্য অংশে যদি এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে, সংসদেও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকুক।"
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বললেন, "সংসদ তো চালু রাখতে হবে, বন্ধ করা যাবে না।"
বিরোধী দলীয় নেতা জবাব দিলেন, "আমি সংসদের অধিবেশন বলিনি, সংসদ ভবন বলেছি।"
এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা গভীর বার্তা যে দেশের মানুষ অন্ধকারে বসে আছে, সেখানে ক্ষমতার আলো জ্বলতে থাকলে তা শুধু অসাম্যই নয়, বরং অমানবিকও।
কৃষক ও শহরের বৈষম্য দূর করতে হবে, এতে দ্বিমত নেই। কিন্তু সমাধানটা কি শুধু রাজধানীতে লোডশেডিং দেওয়া? নাকি উৎপাদন বাড়ানো, অপচয় কমানো, এবং জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান খোঁজা?
প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে লোডশেডিং "সহনীয় পর্যায়ে" আসবে। কিন্তু "সহনীয়" মানেটা কী? যে দেশে গরমে মানুষ মরছে, পরীক্ষার্থীরা পড়তে পারছে না, হাসপাতালে জেনারেটরে চলছে আইসিইউ সেখানে "সহনীয়" মাত্রার লোডশেডিংও একটা ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।
জনগণ চায় আলো, প্রতিশ্রুতি নয়। জনগণ চায় সমাধান, সান্ত্বনা নয়। এবং যদি সংসদে লোডশেডিং দিতেই হয়, তাহলে সেটাও হোক। অন্তত মানুষ বুঝবে যারা ক্ষমতায় বসে আছেন, তারাও একই দেশের নাগরিক। বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে আলোও বৈষম্যহীনভাবে জ্বালাতে হবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :