ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩
Daily Global News

জ্বালানি সংকটের আগুনে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম

জ্বালানি সংকটের আগুনে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন

জমিতে বীজ ফোটে, গাছে কচি পাতাও বের হয়, কিন্তু যদি পানি না পৌঁছায়, তাহলে সেই আশার অঙ্কুর খুব দ্রুতই শুকিয়ে যায়। আজ দেশের অনেক কৃষকের অবস্থাও ঠিক এমনই তারা চাষ করতে চান, ফসল বাঁচাতে চান, কিন্তু জ্বালানির সংকটে সেচ চালাতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে, যখন সেচই ফসলের প্রাণ, তখন ডিজেল বা জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন মানে শুধু কষ্ট নয়, সরাসরি বিপর্যয়ের শঙ্কা।

কৃষকের জীবনে একটি দিনের বিলম্বও অনেক সময় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ধানক্ষেতে সময়মতো পানি না পৌঁছালে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, শীষ ঠিকমতো গড়ে ওঠে না, আর শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, রংপুরসহ বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় জ্বালানি সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে, আর কৃষকেরা জানিয়েছেন চাহিদামতো তেল না পেলে পুরো মৌসুমই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এই সংকটের আঘাত শুধু জমির ভেতরেই থেমে থাকে না। কৃষকের ঘরে ঢুকে পড়ে ঋণের চাপ, বাজারে গিয়ে ধাক্কা লাগে আয়ের স্বপ্নে, আর পরিবারের খাবার টেবিলে আসে অনিশ্চয়তা। অনেক কৃষক মৌসুমের শুরুতে ধারদেনা করে সার, বীজ, শ্রম আর সেচের খরচ জোগাড় করেন; কিন্তু সেচই যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই বিনিয়োগের বড় অংশই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমন অবস্থায় একেকজন কৃষকের কণ্ঠে শুধু হতাশাই নয়, লুকিয়ে থাকে ভয় এই ক্ষতি সামলে আবার শুরু করা কি সম্ভব?

জ্বালানি সংকটের আরও বড় সমস্যা হলো এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। সেচ পাম্প, শ্যালো মেশিন, পরিবহন, বাজারজাতকরণ সবকিছুই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। উৎপাদন খরচ বাড়লে কৃষক লাভ হারান, আর বাজারে সেই চাপ গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর; ফলে সবজির দাম বাড়ে, চালের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়। অর্থাৎ, একটি জ্বালানি সংকট কেবল কৃষকের সমস্যা নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার সংকটও।

সরকারি উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, কোথাও কোথাও কৃষি কার্ডের মাধ্যমে তেল সরবরাহের ব্যবস্থার কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, সেই সুবিধা অনেক কৃষকের কাছে ঠিকমতো পৌঁছায় না। ফলে কৃষকেরা পাম্পের সামনে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, কখনো তেল পান, কখনো পান না, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জমির ফসলও নীরবে সংকটে পড়ে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা, সরবরাহের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব এই তিনটি মিলেই সংকটকে আরও গভীর করছে।

কৃষকের দুর্ভোগের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো তারা খুব কমই অভিযোগ করতে পারেন, কিন্তু ক্ষতি নীরবে বয়ে বেড়ান। একজন কৃষক যখন বলেন, “জমিতে পানি দিতে পারছি না”, এর মানে শুধু সেচ বন্ধ নয়; এর মানে তার পুরো বছরের পরিশ্রম, পরিবারের স্বপ্ন, সন্তানের লেখাপড়া, আর ঋণ শোধের পরিকল্পনা সবকিছু টলে ওঠা। মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল যেন তখন শুধু শস্য নয়, কৃষকের বুকের ভিতরের চাপা আর্তনাদ।

এই পরিস্থিতিতে জরুরি হলো দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃষকদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ বিতরণব্যবস্থা চালু করা, এবং বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়ানো। সোলার পাম্প, সমবায়ভিত্তিক সেচব্যবস্থা, আর মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং এসব উদ্যোগ না নিলে বারবার একই সংকট ফিরে আসবে। কৃষককে শুধু “ধৈর্য ধরুন” বললে হবে না; তাকে কাজ চালানোর মতো বাস্তব সমর্থন দিতে হবে।

শেষ পর্যন্ত, এই সংকট আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয় কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদন করেন না, তিনি একটি দেশের বেঁচে থাকার ভিত গড়ে দেন। সেই কৃষক যদি আজ জ্বালানি সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েন, তাহলে বুঝতে হবে সংকট শুধু মাঠে নয়, রাষ্ট্রের নীতিতেও। এখনই পদক্ষেপ না নিলে যে ক্ষতি হবে, তা এক মৌসুমের নয় এটি বহু মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!