কক্সবাজার ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ উপকূলজুড়ে লবণের সাদা মাঠ যেখানে কিছুদিন আগেও সূর্যের তাপে ঝলমল করছিল উৎপাদনের সাফল্য সেখানে এখন শুধুই ধ্বংসস্তূপের ছবি। হঠাৎ কালবৈশাখীর ঝড় আর টানা ভারি বর্ষণে প্রায় ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ লণ্ডভণ্ড, বন্ধ হয়ে গেছে উৎপাদন। মাত্র দুই দিনের বৈরী আবহাওয়ায় অন্তত ১ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, আর দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির পরিমাণ আরও গভীর।
চলতি মৌসুমে তীব্র দাবদাহ লবণ উৎপাদনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে রেকর্ড ৩২ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই আশার মাঝেই ঝড়-বৃষ্টি যেন সবকিছু কেড়ে নিল এক ঝটকায়।
চৌফলদণ্ডীর লবণচাষি কবির আহমদের মতো হাজারো কৃষকের গল্প এখন এক। ১২ একর জমিতে চাষ করে তিনি হারিয়েছেন প্রায় দেড় হাজার মণ লবণ। তার কণ্ঠে হতাশা, “একটু বৃষ্টিতেই সব শেষ হয়ে গেল, বড় লোকসানে পড়ে গেছি।” শুধু উৎপাদিত লবণই নয়, নষ্ট হয়েছে উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা ‘বেড’ বা ‘কাই’।
শফিউল আলমের ১২ কানি জমির ৩০০ মণ লবণ পানিতে ভেসে গেছে, সৈয়দ আলমের ৫ একর জমি তছনছ, টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় শত শত একর মাঠে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ।
মাঠে এখন চাষিদের ব্যস্ততা পানি সেচ, ত্রিপল মেরামত আর নতুন করে শুরু করার প্রস্তুতি। কিন্তু তাদের চোখে স্পষ্ট অনিশ্চয়তা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি লবণচাষিদের সবচেয়ে বড় সংকট ন্যায্যমূল্যের অভাব। উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১০ টাকার বেশি, বিক্রি করতে হচ্ছে ৫ টাকারও কম দামে, প্রতি মণ উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০০ টাকা, বিক্রি ২৫০-২৬০ টাকায়।
চাষি ছুরুত আলমের ক্ষোভ স্পষ্ট, “ন্যায্য দাম ৪০০-৫০০ টাকা হওয়া উচিত, কিন্তু আমরা অর্ধেক দামে বিক্রি করছি।”
নোয়াপাড়ার গিয়াস উদ্দিনের কণ্ঠে হতাশা, “চার মাস ধরে লোকসান দিচ্ছি, দাদনের টাকা শোধ তো দূরের কথা, সংসারই চালাতে পারছি না।” অনেকেই ঋণ নিয়ে মাঠ নিয়েছিলেন, এখন সেই ঋণই হয়ে উঠেছে দুঃস্বপ্ন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চাষি সংগঠনগুলোর অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে লবণ আমদানির চেষ্টা করছে। যদি তা হয়, তাহলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবিকা আরও সংকটে পড়বে।
বিসিকের তথ্য অনুযায়ী: ১২ দিনের বৃষ্টিতে প্রায় ৩ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন কমেছে, লক্ষ্যমাত্রা: ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন, এখন পর্যন্ত উৎপাদন: ১৭ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন। তবে আশার কথা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এখনও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
আবহাওয়া অফিস বলছে: আরও ২–৩ দিন বৃষ্টি থাকতে পারে, ৫ মে’র পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা, ১৪ মে থেকে তীব্র দাবদাহ শুরু হতে পারে, যা লবণ উৎপাদনের জন্য অনুকূল।
প্রকৃতির এক ঝড়ে ভেঙে গেছে হাজারো প্রান্তিক চাষির স্বপ্ন। কিন্তু সংকট শুধু আবহাওয়ার নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজারব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য, আর নীতিগত দুর্বলতা। লবণের মাঠে এখন শুধু সাদা স্ফটিক নয়, জমে আছে কষ্ট, অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার লড়াই।


আপনার মতামত লিখুন :