বিশ্ব রাজনীতির দাবার চালে যখন মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত, তখন বাংলাদেশের জন্য প্রশান্তির এক চিলতে বাতাস হয়ে এলো তেহরানের অভয়বার্তা। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের জ্বালানি ধমনী হিসেবে পরিচিত এই সরু জলপথটি বর্তমানে যুদ্ধংদেহী ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘নো গো জোন’ হলেও, বাংলাদেশি জাহাজের জন্য তা উন্মুক্ত থাকছে। সোমবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রদূতের বৈঠক শেষে যে নিশ্চয়তা মিলেছে, তা কেবল কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল রক্ষাকবচ।
ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি তারা পুরোপুরি বন্ধ করেনি; বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা থাকা জাহাজগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশ এই দ্বন্দ্বে সরাসরি কোনো পক্ষ না হওয়ায় এবং কৌশলগত বন্ধুত্বের খাতিরে ইরান আমাদের জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না। তবে শর্ত একটাই নিরাপত্তার খাতিরে পরিচয় ও অবস্থান আগেভাগেই জানাতে হবে। এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও পেশাদার শর্ত, যা ভুলবশত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সহায়ক হবে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের বক্তব্যটি এই মুহূর্তে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দেশে তেলের কোনো বাস্তব সংকট নেই। রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল আর গাড়ির যে দীর্ঘ সারি আমরা দেখছি, তা মূলত মানুষের মনের ভেতরের ‘উদ্বেগ’ ও ‘আতঙ্ক’ থেকে সৃষ্টি। যখন মানুষ গুজব শোনে যে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সংগ্রহ করতে চায়। একেই অর্থনীতিতে বলা হয় ‘প্যানিক বায়িং’। প্রতিমন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর যে তেলের দাম আপাতত বাড়ছে না, তা সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে।
পরিসংখ্যান বলছে, ভয়ের কোনো কারণ নেই। সোমবারই সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রামে ভিড়েছে। চলতি সপ্তাহেই আরও ১ লাখ ২০ হাজার ২০৫ টন জ্বালানি নিয়ে আরও চারটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে। অর্থাৎ, চাহিদার বিপরীতে জোগানের পাইপলাইন সচল আছে। এছাড়া ভারত থেকেও ৫ হাজার টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতির খামখেয়ালি চরিত্রের মতোই ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ সমাপ্তির ইঙ্গিত বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমিয়ে দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় সুখবর। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, হরমুজ প্রণালিতে এখনো প্রায় হাজারখানেক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। বিমা সুবিধার অভাব আর নিরাপত্তা ঝুঁকি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের গতি ৯০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখা ছিল সরকারের এক দূরদর্শী পদক্ষেপ।
আগামী রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে জ্বালানি ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশ থেকে আসা এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি দ্রুত পাম্পগুলোতে পৌঁছে দেওয়া এবং খুচরা বাজারে কোনো ধরনের কারসাজি বা পাচার রোধ করা। মানুষের মন থেকে তেলের অভাবের ‘ভয়’ দূর করতে হলে রেশনিং ব্যবস্থার সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের আগুনি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে, তা সফল। এখন প্রয়োজন ধৈর্য এবং গুজবে কান না দিয়ে সাশ্রয়ী হওয়া। আন্তর্জাতিক সংকট যখন আমাদের হাতের নাগালে নেই, তখন অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা আর সঠিক ব্যবস্থাপনা দিয়েই আমাদের এই কঠিন সময় পাড়ি দিতে হবে।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :