‘জীবনে একা চলতে শেখা দরকার…’ ঠিক এক মাস আগে, গত ২৯ মে নিজের ফেসবুক ওয়ালে কথাটি লিখেছিল ১৬ বছরের কিশোর জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত। তখন হয়তো সে নিজেও ভাবেনি, কতটা ভয়ঙ্কর ও নির্মমভাবে এই বাক্যটি তার জীবনে সত্যি হয়ে ধরা দেবে।
গত বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে সিফাতের মা ও তিন বোনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রক্তক্ষয়ী সেই ঘটনার পর ওই পরিবারে এখন কেবল সিফাতই জীবিত আছে।
নিহতদের পৈতৃক নিবাস কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে। গত শুক্রবার রাতে সেখানকার সামাজিক কবরস্থানে মা ও তিন বোনকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। দাফন শেষে সিফাত এখন গ্রামের বাড়িতেই রয়েছে, তবে আজ রোববার তার রায়পুরে ফেরার কথা।
শনিবার রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগের সময় আবেগ ধরে রাখতে পারছিল না সিফাত। ফেসবুক স্ট্যাটাসের কথা মনে করিয়ে দিতেই সে বলে, “কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া স্রেফ মনের খেয়ালেই কথাগুলো লিখেছিলাম। ভাবিনি কোনোদিন আমার ভাগ্য এভাবে মিলে যাবে। এখন মনে হচ্ছে, দুনিয়াতে আমি সত্যিই বড্ড একা।”
সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে সিফাত বলে, “আমি দোকানে কাজ করছিলাম। খবর পেয়ে যখন দৌড়ে বাসায় আসি, দেখি রান্নাঘরে মায়ের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে আছে। পাশের ঘরে আমার তিন বোন নিথর হয়ে পড়ে ছিল। পুরো ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। এই দৃশ্য আমি চোখ থেকে কিছুতেই সরাতে পারছি না।”
ছোট বোনের কথা মনে করে সে আরও বলে, “প্রতিদিন সকালে কাজে যাওয়ার সময় ছোট বোন সিপাকে আমিই স্কুলে নামিয়ে দিতাম। সেদিন সকালেও ওকে ডেকেছিলাম, কিন্তু ও গভীর ঘুমে থাকায় আর বিরক্ত করিনি। জানলে কি আর ওভাবে রেখে যেতাম? ওটাই যে শেষ দেখা হবে বুঝতে পারিনি।”
রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকায় নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় গত বৃহস্পতিবার এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহতরা হলেন, শাহিনুর বেগম (৪০), তাঁর বড় মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), মেজো মেয়ে নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) এবং ছোট মেয়ে ফাতেমা আক্তার সিপা (১০)।
হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে ধরে গণপিটুনি দেয় স্থানীয় জনতা। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে এবং তার বাবার নাম কার্তিক মজুমদার।
অন্তর প্রসঙ্গে সিফাত জানায়, “অন্তর আগে আমাদের ভবনের ওপরের তলায় ভাড়া থাকত। সেই সূত্রে সামান্য হাই-হ্যালো হতো। কিন্তু ওর সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা বা গভীর মেলামেশা ছিল না। সে এমন একটা কাণ্ড ঘটাতে পারে, তা এখনো আমার মাথায় ঢুকছে না।”
ঘটনাস্থল থেকে একটি ধারালো ছেনি উদ্ধার করেছে পুলিশ। সিফাতের দাবি, অস্ত্রটি তাদের ঘরের নয়। অন্তর হয়তো আগে থেকেই খুনের প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রটি সাথে করে এনেছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে কুমিল্লা থেকে রায়পুরে এসে সপরিবারে বসবাস শুরু করেছিলেন সিফাতের বাবা কামাল হোসেন। তবে ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি মারা যান। এরপর থেকে মা শাহিনুর বেগমই একা হাতে চার সন্তানকে নিয়ে সংসারের হাল টানছিলেন। সম্প্রতি মায়ের কষ্ট লাঘব করতে সিফাত একটি রড-সিমেন্টের দোকানে কাজ শুরু করে।
হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রসঙ্গে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এই নৃশংসতার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা মদদদাতা আছে কি না, তা সবদিক বিবেচনা করে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এদিকে সিফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানিয়েছেন কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। তিনি সিফাতকে কুমিল্লায় নিয়ে এসে তার পড়াশোনাসহ ভবিষ্যতের সমস্ত দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেন। সংসদ সদস্য বলেন, “সব হারিয়ে ফেলার পর রায়পুরের ওই বাসায় একা থাকা সিফাতের জন্য নিরাপদ নয়।”
পাশাপাশি সিফাতের পৈতৃক সম্পত্তি যেন দ্রুত তার কাছে হস্তান্তর করা হয়, সে বিষয়ে তার চাচা ও গ্রামবাসীকে তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া ঘটনার পেছনের মূল রহস্য উদঘাটনে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপারের সাথেও কথা বলেছেন বলে জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন হোমনা উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মহিউদ্দিন, কুমিল্লা উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লা এবং হোমনা পৌর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বিদায়লগ্নে সংসদ সদস্য সিফাতের হাতে জরুরি খরচের জন্য কিছু নগদ অর্থ তুলে দেন।


আপনার মতামত লিখুন :